তুরস্কের সমৃদ্ধ স্থাপত্য ঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে বাইজেন্টাইন গির্জা, সেলজুক সরাইখানা, অটোমান প্রাসাদ, মসজিদ, সিনাগগ, মঠ এবং প্রাথমিক প্রজাতন্ত্রী আমলের গুরুত্বপূর্ণ ভবন। যুদ্ধের প্রভাব, বাস্তুচ্যুতি, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের মতো বিভিন্ন কারণে তুরস্কের এই ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো দীর্ঘকাল ধরে অবহেলার শিকার ছিল। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত আবাসন ও কংক্রিটের উন্নয়নের চাপে ঐতিহাসিক এলাকাগুলো হুমকির মুখে পড়ে।
১৯৯৪ সালে ইস্তাম্বুলের মেয়র হওয়ার আগে থেকেই প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এই পরিবর্তনগুলো কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ২০০১ সালের ১৪ আগস্ট একে পার্টি প্রতিষ্ঠার পর ক্ষমতায় এসে তার সরকার ঐতিহাসিক স্থানগুলোর পুনরুদ্ধার ও অভিযোজিত পুনঃব্যবহারকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। এরদোয়ানের মতে, ইস্তাম্বুলের মেয়র, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দীর্ঘ যাত্রায় হাজিয়া সোফিয়া গ্র্যান্ড মসজিদ পুনরায় খুলে দেওয়া এবং রামি ব্যারাকস পুনরুদ্ধার তার অন্যতম স্বপ্নের প্রকল্প।
সাংস্কৃতিক ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী সরদার কাম জানিয়েছেন, গত দুই দশকে তুরস্কের সংরক্ষণ কৌশল কেবল শারীরিক মেরামতে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সামগ্রিক মডেলে উন্নীত হয়েছে। এতে বৈজ্ঞানিক নথিপত্র, মূল বৈশিষ্ট্যের সুরক্ষা, স্থায়িত্ব এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে সমাজের সংযোগ স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। হাজিয়া সোফিয়া গ্র্যান্ড মসজিদ এখন বিজ্ঞানসম্মত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের পাশাপাশি ধর্মপ্রাণ মানুষ ও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।
সরকারের এই কার্যক্রম কেবল ইস্তাম্বুলেই সীমাবদ্ধ নেই। রামি ব্যারাকস, মেডেনস টাওয়ার, গালাটা টাওয়ারসহ অটোমান সুলতানদের সমাধি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি তুরস্কের অন্যান্য অঞ্চলে যেমন আনির প্রাচীন শহর, ত্রাবজোনের মঠ এবং আদানার পুরনো সুতা কারখানা সংরক্ষণের কাজও চলছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইয়েলদিজ প্রাসাদ পুনরায় খোলার সময় এরদোয়ান জানান, ২০০২ সাল থেকে প্রায় ৬,০০০ ফাউন্ডেশন-মালিকানাধীন সাংস্কৃতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং টিআইকেএ-এর মাধ্যমে বিদেশে ১২০টিরও বেশি প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে।
সরকার কেবল দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপত্য নয়, বরং মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতাগুলোকেও উন্মোচনের চেষ্টা করছে। ইস্তাম্বুলের মারমারে রেল প্রকল্পের সময় ইয়েনিকাপিতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে নব্যপ্রস্তর যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে শুরু হওয়া 'লিগ্যাসি টু দ্য ফিউচার' উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্নতাত্ত্বিক কাজের পরিধি আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালে ৬৫টি প্রদেশের ২৫৫টি সাইটে দুই হাজারের বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক ও শিল্প ইতিহাসবিদ কাজ করছেন।
রামি ব্যারাকসকে একটি আধুনিক লাইব্রেরিতে রূপান্তর করা সরকারের 'অভিযোজিত পুনঃব্যবহার' কৌশলের একটি চমৎকার উদাহরণ। ২০২৬ সালের আগস্টে এই লাইব্রেরিটি আন্তর্জাতিক 'আইএফএলএ গ্রিন লাইব্রেরি অ্যাওয়ার্ড' অর্জন করে। এছাড়া, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থাপনা সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ২০২৩ সালে মোর এফরেম সিরিয়াক অর্থোডক্স চার্চের উদ্বোধন করা হয়েছে, যা তুরস্কের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন ইস্তাম্বুল সিরিয়াক অর্থোডক্স চার্চ ফাউন্ডেশনের সম্মানসূচক সভাপতি সাইদ সুসিন।

