"খেলাধুলা এমনই বস। এখানে কোনো ফেভারিট নেই, কোনো আন্ডারডগও নেই।" ডারউইনের মারারা ওভালের পাশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের মুখে শোনা গেল এই সাতটি শব্দ। শান্ত-মুশফিকদের এই কোচের শান্ত ও আবেগহীন আচরণে দলের সবাই অভ্যস্ত। ডারউইনে রবিবার বিকেলে যখন টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম বড় রূপকথা লিখেছে বাংলাদেশ, চারপাশের সবাই যখন উল্লাসে মেতে উঠছিল, তখনও শান্ত ছিলেন সিমন্স। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত অবশ্য কোচের এমন আচরণে মোটেও অবাক হননি। মোমিনুল হকের ব্যাট থেকে যখন ঐতিহাসিক জয়সূচক বাউন্ডারিটি আসছিল, তার ঠিক ৪৫ মিনিট পর সিমন্স এই মন্তব্য করেন।
এই টেস্টের আগে সিমন্সের একটাই সহজ বার্তা ছিল দলের প্রতি—"টেস্টের প্রতিটি দিন ওদের মাঠে আটকে রাখো।" ডারউইনের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণকে চার দিন ধরেই মাঠে খাটিয়েছে শান্তর দল। শুধু তাই নয়, টেস্টের ১৪টি সেশনের সবকটিতেই আধিপত্য বিস্তার করে জিতেছে বাংলাদেশ। এটি ছিল একটি নিখুঁত টেস্ট জয়ের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।
প্রথম দিন হাসান মাহমুদের নেতৃত্বে পেসাররা দাপট দেখান। দ্বিতীয় দিন তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি এবং শান্ত ও মুশফিকুর রহিমের অবদানে ব্যাটাররা কর্তৃত্ব বজায় রাখেন। তৃতীয় দিন লোয়ার অর্ডার ব্যাটাররা লড়াই চালিয়ে লিডকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যান। আর চতুর্থ দিন মেহেদী হাসান মিরাজের নেতৃত্বে স্পিনাররা প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করেন। ডারউইনের পিচ কিউরেটর জেক পাভলিচের তৈরি উইকেট সব বিভাগকেই দারুণভাবে সাহায্য করেছে।
অস্ট্রেলিয়াকে তাদের নিজেদের মাটিতেই এভাবে উড়িয়ে দেওয়ার পর এই জয়কে কেবল একটি 'অঘটন' বলা হয়তো অন্যায় হবে। কারণ পুরো ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগই পায়নি। ২০২৪ সালে গ্যাবায় এক পায়ে লড়ে শামার জোসেফের ম্যাচ জেতানো কিংবা ২০১৯ সালে হেডিংলিতে বেন স্টোকসের অবিশ্বাস্য ইনিংসের মতো অলৌকিক কোনো পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করতে হয়নি বাংলাদেশকে। এটি ছিল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ দাপুটে এক জয়। দ্বিতীয় দিন থেকেই ম্যাচটি অস্ট্রেলিয়ার হাত থেকে ফসকে যেতে শুরু করেছিল।
এই জয়ের মাহাত্ম্য বুঝতে হলে একটু অতীতে তাকাতে হবে। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পায়নি বাংলাদেশ, কারণ তাদের যথেষ্ট যোগ্য মনে করা হয়নি। অধিনায়ক শান্ত সিরিজ শুরুর আগে বলেছিলেন, তারা কেবল ভালো ক্রিকেট খেলতে চান না, বরং অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটের সম্মান অর্জন করতে চান যাতে ভবিষ্যতে আবারও আমন্ত্রিত হওয়া যায়। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে টেস্ট খেলছেন মুশফিকুর রহিম। শান্ত স্বভাবের মুশফিককে ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সাথে হাত মেলানোর প্রথাগত সারি ছেড়ে স্মারক হিসেবে উইকেট থেকে দুটি স্টাম্প তুলে নিতে দেখা যায়।
এই জয়টি কেবল একটি ম্যাচ জয় ছিল না, এটি ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা। বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে বুঝিয়ে দিল যে তাদের মাটিতে টেস্ট খেলার যোগ্যতা লাল-সবুজদের আছে। একই সাথে ১৯৯৫ সালে পাকিস্তানের পর ভারত ছাড়া উপমহাদেশের আর কোনো দল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জিততে পারেনি। সেই দীর্ঘ খরা কাটিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের কাছে বাংলাদেশ নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিল। ম্যাকাইয়ের ফ্ল্যাট পিচে পরের টেস্টে নামার আগে এখন সিরিজ হারের চাপ পুরোটাই থাকবে অস্ট্রেলিয়ার ওপর।
ম্যাচ শেষে ডারউইনের মারারা ওভালে উদযাপনের কমতি ছিল না। মুশফিকুর রহিমের "ছবি, ছবি" চিৎকারে মেতে উঠেছিল পুরো দল। ঐতিহাসিক এই মুহূর্তে মাঠে উপস্থিত ছিলেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, এমনকি বাংলাদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রীও ভিডিও কলে অভিনন্দন জানান। দলের সাথে ছবির ফ্রেমে বন্দি হন সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারও। নিজের ফোনে ৫০টি মিসড কল দেখে লাজুক হেসে বাশার বলেন, "২০০৩ সালের আমাদের শেষ সফরের চেয়ে এটি একেবারেই আলাদা।" আর ছবির ঠিক মাঝখানে বসে মৃদু হাসছিলেন ফিল সিমন্স, যিনি আড়ালে থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে স্মরণীয় দিনটির রূপরেখা তৈরি করেছেন।

