শেখ হাসিনার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল গণভবন, যেখান থেকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ব্যক্তিগত শত্রুদের দমনের নীলনকশা তৈরি করা হতো। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গণভবন থেকে উদ্ধার হওয়া নথিপত্রের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার পরিবারকে নিয়ে তৈরি ‘টার্গেট প্রোফাইল’। এই নথিতে তার জন্মস্থান চট্টগ্রামের রাউজান, জন্ম তারিখ ১৩ মার্চ ১৯৪৯, তার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী, তিন ভাই গিয়াসউদ্দিন, জামালউদ্দিন ও সাইফুদ্দিন, স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী এবং দুই ছেলে হুম্মাম ও ফজলুল এবং মেয়ে ফারজিন কাদের চৌধুরীর বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষিত ছিল। নথিতে তার শিক্ষাজীবন, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য, রাজনৈতিক পরিচয়, সংসদ সদস্য হিসেবে ইতিহাস এবং মামলার তথ্যাদি এমনভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, যেন গণভবন থেকে এই পরিবারের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখা হচ্ছিল।
এই নথির গুরুত্ব এখানেই যে, এটি কেবল জীবনী নয়, বরং একটি পুরো পরিবারকে রাষ্ট্রীয় নজরদারির মধ্যে রাখার প্রমাণ। হুম্মাম কাদের চৌধুরী ‘আয়নাঘর ফাইলস’ নামক ডকুমেন্টারিতে উল্লেখ করেছেন যে, তার বাবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং দাফনের স্থান নির্ধারণের মতো সিদ্ধান্তগুলো সরাসরি গণভবন থেকে আসত এবং তার বাবার শেষ ইচ্ছাও পূরণ করা হয়নি।
বিচারপ্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে তার সহপাঠী এবং তৎকালীন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক শামীম হাসনাইন সাক্ষ্য দিতে চাইলেও তাকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল শুনানিতে পাকিস্তান বৈরী রাষ্ট্র বলে তাদের শিক্ষাসনদ গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সাইফার মেসেজ অনুযায়ী, চারজন সাক্ষীকে ভিসা না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করে তোলে। স্কাইপ কেলেঙ্কারির অডিওতে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিজামুল হক নাসিমকে বিচারপতির পদের প্রলোভন পেতেও শোনা গিয়েছিল। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজেও বলেছিলেন, রায়টি বেলজিয়াম অর্থাৎ গণভবনের নির্দেশে হয়েছে।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে সাত মাস জেইসি সেলে গুম করে রাখা হয়, যেখানে তাকে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং সেখানে তার কোড নাম ছিল ‘ভিআইপি-১’। সেলের দেয়ালে তিনি নিজের বন্দিত্বের চিহ্ন হিসেবে ‘এইচকিউসি’ লিখে রেখেছিলেন।
গণভবনের এই নথিগুলো এখন জুলাই জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে, যা শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রমাণ হিসেবে কাজ করছে। এই দলিলগুলো স্পষ্ট করে যে, হাসিনা শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেই পরাজিত করতে চাননি, বরং পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিলেন। যে ভবন থেকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নজরদারি ও টার্গেটের চোখে দেখা হতো, আজ সেই ভবনে দাঁড়িয়ে জনগণ ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ দেখছে।

