যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবসর ভাতা ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তা (সোশ্যাল সিকিউরিটি) তহবিল যখন বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি, তখন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্ট্রেলিয়ার অবসর মডেলটি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখার ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থনীতিবিদদের কাছে প্রশংসিত অস্ট্রেলিয়ার এই ব্যবস্থায় কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক সঞ্চয় কর্মসূচি রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ৪০১(কে) (401k) ব্যবস্থার মতো।
আমেরিকার বর্তমান অবসর ভাতা ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ২০৩২ সালের মধ্যে মার্কিন জাতীয় অবসর ট্রাস্ট ফান্ড বা সোশ্যাল সিকিউরিটি দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে বেসরকারি খাতের মাত্র অর্ধেক কর্মী কর্মক্ষেত্রের অবসরকালীন পরিকল্পনায় অংশ নেন, যা সোশ্যাল সিকিউরিটির পরিপূরক হওয়ার কথা ছিল। ফলে লাখ লাখ মার্কিন কর্মী অবসরের জন্য কোনো সঞ্চয় করতে পারছেন না। এএআরপি (AARP)-এর হিসাব অনুযায়ী, সোশ্যাল সিকিউরিটির রিজার্ভ শেষ হয়ে গেলে এটি মাত্র ৮৩ শতাংশ পূর্ণ সুবিধা দিতে সক্ষম হবে। ২০২৫ সালের মার্সার সিএফএ ইনস্টিটিউট গ্লোবাল পেনশন ইনডেক্সে মার্কিন অবসর ব্যবস্থা 'সি+' (C+) গ্রেড পেয়েছে, যেখানে অস্ট্রেলিয়া পেয়েছে 'বি+' (B+)।
অস্ট্রেলিয়ার মডেলটি আমেরিকার চেয়ে বেশ আলাদা এবং প্রশংসনীয়। সেখানে নিয়োগকর্তারা প্রতিটি কর্মীর বেতনের ১২ শতাংশ ৪০১(কে) স্টাইলের অ্যাকাউন্টে জমা দিতে বাধ্য থাকেন। এছাড়া যাদের পর্যাপ্ত আয় বা সম্পদ নেই, তাদের জন্য রয়েছে রাষ্ট্রীয় পেনশন সুবিধা। বোস্টন কলেজের সেন্টার ফর রিটায়ারমেন্ট রিসার্চের পরিচালক অ্যান্ড্রু এশট্রুথ জানান, অস্ট্রেলিয়া তাদের জিডিপির অনেক কম অংশ এই কর্মসূচিতে ব্যয় করেও অবসরপ্রাপ্তদের দারিদ্র্য থেকে রক্ষা করছে। লিবারটেরিয়ান আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো অ্যান্ড্রু বিগস বলেন, আজ যদি নতুন করে কোনো অবসর ব্যবস্থা তৈরি করতে হতো, তবে নিশ্চিতভাবেই অস্ট্রেলিয়ার মতো কিছু করা হতো।
ট্রাম্প গত ৬ জুলাই শিশুদের জন্য ফেডারেল সঞ্চয় কর্মসূচি 'ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস' চালুর অনুষ্ঠানে বলেন, অস্ট্রেলিয়ার এই ব্যবস্থাটি অত্যন্ত সফল ও সম্মানিত। তিনি এটি বাস্তবায়নের বিষয়ে কংগ্রেসের সাথে আলোচনা করবেন বলে জানান। ট্রাম্পের এই উদ্যোগটি বাইডেন প্রশাসনের ২০২২ সালের 'সেভার্স ম্যাচ' চালুর প্রক্রিয়ার সাথে মিলে যায়, যা কম আয়ের কর্মীদের বছরে ১,০০০ ডলার পর্যন্ত সরকারি অনুদান দেয়। দ্য নিউ স্কুল ফর সোশ্যাল রিসার্চের শ্রম অর্থনীতিবিদ তেরেসা ঘিলারদুচ্চি বলেন, প্রেসিডেন্ট চান প্রতিটি মার্কিন কর্মীর যেন অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি অবসর অ্যাকাউন্ট থাকে। তবে অস্ট্রেলিয়ায় সঞ্চয় বাধ্যতামূলক হলেও আমেরিকায় তা বাধ্যতামূলক করা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বিভক্ত।
কেটো ইনস্টিটিউটের বাজেট নীতি পরিচালক রোমিনা বোচিয়া মনে করেন, বাধ্যতামূলক সঞ্চয় কম আয়ের কর্মীদের ক্ষতি করবে, কারণ তাদের দৈনন্দিন খরচের জন্য পুরো বেতনের প্রয়োজন হয়। তাছাড়া নিয়োগকর্তার অবদান মূলত কর্মীর বেতন থেকেই কেটে নেওয়া হয়। অন্যদিকে, ঘিলারদুচ্চি মনে করেন সবারই সঞ্চয় করা উচিত, এটি কোনো ট্যাক্স নয় বরং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়। বিগস পরামর্শ দিয়েছেন, সোশ্যাল সিকিউরিটি সুবিধা সীমিত করে (যেমন ওয়াশিংটন থিঙ্ক ট্যাংক 'কমিটি ফর এ রেসপন্সিবল ফেডারেল বাজেট' দম্পতিদের জন্য বার্ষিক সুবিধা ১,০০,০০০ ডলারে সীমাবদ্ধ করার প্রস্তাব করেছে) এবং সবাইকে ৪০১(কে) অ্যাকাউন্টে বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্ত করে এই সংকটের সমাধান করা সম্ভব।
তবে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অবসর নিরাপত্তা প্রকল্পের পরিচালক গোপী শাহ গোদা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বর্তমান ব্যবস্থা থেকে অস্ট্রেলিয়ার মডেলে যাওয়া সহজ নয়। অস্ট্রেলিয়ার 'এজ পেনশন' ব্যবস্থাটি মূলত দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি, যেখানে ২০২৫ সালে একক ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ বার্ষিক সুবিধা ছিল প্রায় ২৮,০০০ ডলার। বিপরীতে, ২০২৬ সালে মার্কিন সোশ্যাল সিকিউরিটি সর্বোচ্চ ৬২,১৭২ ডলার পর্যন্ত দিয়ে থাকে। বর্তমান কর্মীরা যে সুবিধা পাওয়ার আশায় অর্থ জমা দিয়েছেন, তা হঠাৎ কমিয়ে দিলে তারা প্রতারিত বোধ করবেন। তাই এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
