টেস্ট ক্রিকেটে নো-বল বা ওভারস্টেপিং এড়াতে বোলারদের লাইন বজায় রাখা একটি মৌলিক শৃঙ্খলা হিসেবে গণ্য করা হয়, বিশেষ করে স্পিনারদের ক্ষেত্রে। কিন্তু ভারতীয় স্পিন বোলিং ইউনিট যেন এই লাইনটি কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। এই সমস্যাটি এখন এতটাই প্রকট রূপ নিয়েছে যে, ভারতের স্পিন বোলিং কোচ সাইরাজ বাহুতুলে রসিকতা করে টেস্টেও নো-বলের জন্য 'ফ্রি-হিট' চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে বোলাররা আরও সতর্ক হতে বাধ্য হন। তবে বাহুতুলের এই প্রস্তাব অদ্ভুত শোনালেও, পরিসংখ্যান বলছে ভারতীয় স্পিনারদের নো-বল করার প্রবণতা এখন গভীর আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।
কলম্বো টেস্টের চতুর্থ দিনে শ্রীলঙ্কা যখন লড়াই করে ম্যাচটি শেষ দিনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন ভারতের স্পিনাররা একাই ৫টি নো-বল করেন। এর ফলে ম্যাচে তাদের নো-বলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০-এ। যদিও এই নো-বলগুলোর কারণে ভারতকে কোনো উইকেট হারাতে হয়নি, তবে সমস্যাটিকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তিন মাসেরও কম সময় ধরে ভারতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়া বাহুতুলে ইতিমধ্যেই তার স্পিনারদের একটি লজ্জাজনক রেকড গড়তে দেখেছেন। চলমান টেস্টে ভারতীয় স্পিনাদের করা ১০টি নো-বল টেস্ট ইতিহাসে কোনো স্পিন আক্রমণের তৃতীয় সর্বোচ্চ নো-বল করার রেকর্ড। আর মাত্র ৬টি নো-বল করলেই তারা এই তালিকার শীর্ষে পৌঁছে যাবে।
বাহুতুলে বলেন, "আপনি যদি নো-বল করেন, তবে তার একটি পরিণতি থাকবেই। আমি নিয়মের কোনো অভিভাবক নই, তবে যদি ফ্রি-হিটের নিয়ম আসে, তবে অবশ্যই নো-বলের সংখ্যা কমে যাবে। কোনো দলই বাড়তি বল এবং বাড়তি রান দিতে চাইবে না।"
এটি কেবল একটি ম্যাচের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মাত্র এক সপ্তাহ আগে গল টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে রবীন্দ্র জাদেজার একটি নো-বল ভারতকে চড়া মূল্য চুকিয়েছিল। জাদেজার ঘূর্ণি ও ড্রিপে বিভ্রান্ত হয়ে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক ধনঞ্জয়া ডি সিলভা প্রথম স্লিপে কেএল রাহুলের হাতে ক্যাচ দিয়ে বসেন। কিন্তু জাদেজা ওভারস্টেপ করায় বেজে ওঠে নো-বলের সাইরেন, আর লঙ্কান অধিনায়ক জীবন ফিরে পেয়ে হাসিমুখে ক্রিজে টিকে থাকেন।
২০২০ সালের শেষের দিকে ইংল্যান্ড-পাকিস্তান টেস্ট সিরিজ থেকে টিভি আম্পায়ারদের নো-বল ডাকার দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক চমকপ্রদ চিত্র উঠে আসে। এই সময়ে কাগিসো রাবাদা, বেন স্টোকস এবং জাসপ্রিত বুমরাহ ছাড়া আর কোনো বোলার জাদেজার চেয়ে বেশি নো-বল করেননি। ২০১২ সালে অভিষেকের পর থেকে ২০২০ সালে টিভি আম্পায়ারের নো-বল ডাকার নিয়ম চালুর আগ পর্যন্ত জাদেজা মাত্র ১৮টি নো-বল করেছিলেন। কিন্তু এরপর থেকে তিনি ৮৯ বার ওভারস্টেপ করেছেন। স্পিনারদের মধ্যে এই তালিকায় তার পরেই আছেন পাকিস্তানের নোমান আলী, যার চেয়ে জাদেজা ৪৯টি নো-বল বেশি করেছেন। এই সময়ে ১৬ জন বোলার ৪০টির বেশি নো-বল করেছেন, যার মধ্যে জাদেজাই একমাত্র স্পিনার।
এই সমস্যা কেবল জাদেজার একার নয়। ভারতীয় স্পিন আক্রমণ বর্তমানে একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চলমান সিরিজে ভারতের অনভিজ্ঞ স্পিন ইউনিট মোট ১৫টি নো-বল করেছে, যেখানে শ্রীলঙ্কার স্পিনাররা করেছে মাত্র ৫টি। এই সিরিজে জাদেজা ৮টি, সারাংশ জৈন ৬টি এবং মানব সুতার ১টি নো-বল করেছেন। সুতারের নো-বলটি হয়েছিল বোলিং স্ট্রাইডের সময় স্টাম্পে আঘাত করার কারণে।
স্পিন কোচ বাহুতুলে স্বীকার করেছেন যে তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, "সত্যি বলতে, এটি এমন একটি বিষয় যা নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমরা এটাকে অবহেলা করছি না। মাঝে মাঝে উইকেট না পাওয়ার পরিস্থিতিতে বোলাররা যখন অতিরিক্ত চেষ্টা করে, তখন তাদের মধ্যে লাইন পেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। তবে এটি কোনো অজুহাত হতে পারে না। জাদেজার রান-আপের 'টেক-অফ পয়েন্ট' নিয়ে অনেক কাজ করা হচ্ছে। সাধারণত নেটে তারা ভালোই বল করে, কিন্তু ম্যাচে অতিরিক্ত জোর দিতে গিয়ে তারা ভুল করে বসে। তবে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি এবং আমি নিশ্চিত তারা এটি সংশোধন করে আরও ভালো করবে।"
বর্তমানে কলম্বো টেস্টে জাদেজার সঙ্গী হিসেবে খেলছেন একজন অভিষিক্ত এবং অন্যজন যার এটি মাত্র তৃতীয় টেস্ট। এই তরুণ স্পিন ইউনিটের ধারাবাহিকতা পেতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে আপাতত ফ্রি-হিটের মতো নিয়মের আশা না করে, নো-বল না করাকেই নিজেদের প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ভারতীয় স্পিনারদের।

