নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর, সাংবাদিক এবং নাগরিক অধিকারকর্মী গ্লোরিয়া স্টেইনম বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ৯২ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন। তার অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম পেজে এই সংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে। পোস্টে জানানো হয়, গ্লোরিয়া নিউইয়র্ক সিটিতে তার নিজ বাসভবনে প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার প্রায় এক শতাব্দীর জীবন ছিল অর্জনে পরিপূর্ণ এবং তিনি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সমতার জন্য কাজ করে গেছেন।
১৯৩৪ সালের ২৫ মার্চ ওহাইও অঙ্গরাজ্যের টলেডোর উপকণ্ঠে জন্মগ্রহণ করেন স্টেইনম। তার বাবা ছিলেন একজন ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা এবং শৈশবের শুরুর বছরগুলো তিনি একটি ট্রেলার হোমে কাটিয়েছেন। ১৯৪৬ সালে বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি তার মায়ের সাথে বসবাস করেন, যিনি মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। স্টেইনম পরবর্তীকালে তার লেখায় এবং সক্রিয়তায় বারবার উল্লেখ করেছেন যে, মায়ের দেখাশোনা করার সেই অভিজ্ঞতা তাকে খুব দ্রুত পরিণত হতে শিখিয়েছিল। তবে তিনি তার বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছিলেন, তার মা তাকে একটি ভালোবাসাময় শৈশব উপহার দিয়েছিলেন এবং তার বাবা তাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে শান্ত থাকতে শিখিয়েছিলেন।
১৯৫৬ সালে ম্যাসাচুসেটসের স্মিথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর একটি ফেলোশিপ নিয়ে তিনি ভারতে যান। ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত সেখানে অবস্থানকালে তিনি অহিংস প্রতিবাদ এবং তৃণমূল পর্যায়ের সক্রিয়তা সম্পর্কে গভীরভাবে জ্ঞান অর্জন করেন, যা তার সামাজিক পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন রূপ দেয়। ১৯৫৭ সালে ২২ বছর বয়সে তিনি একটি গর্ভপাত করান, যা তখন অবৈধ ছিল। তিনি তার ২০১৫ সালের স্মৃতিকথা 'মাই লাইফ অন দ্য রোড'-এ এই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন এবং বইটি সেই চিকিৎসক ডা. জন শার্পকে উৎসর্গ করেন, যিনি তাকে বলেছিলেন, 'তুমি কাউকে আমার নাম বলবে না এবং তুমি তোমার জীবন নিয়ে যা খুশি তা করবে।'
১৯৬০ সালে নিউইয়র্কে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন স্টেইনম। তৎকালীন পুরুষশাসিত সংবাদমাধ্যমে নারীদের কেবল ফ্যাশন বা গৃহস্থালি বিষয়ে লিখতে বাধ্য করা হতো। রাজনৈতিক প্রতিবেদন লেখার সুযোগ চাইলে তাকে বলা হতো, 'আমি তোমাকে সেভাবে দেখি না।' এই বৈষম্যের প্রতিবাদে তিনি নিজেই উদ্যোগী হন। ১৯৬৩ সালে হিউ হেফনারের প্লেবয় ক্লাবে ওয়েট্রেস হিসেবে ছদ্মবেশে কাজ করে তিনি সেখানকার নারীদের কর্মপরিবেশ এবং যৌন হয়রানির চিত্র তুলে ধরেন, যা তাকে জাতীয় পর্যায়ে খ্যাতি এনে দেয়।
পরবর্তীতে তিনি নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৭১ সালে বেটি ফ্রিডান, বেলা আবজুগ এবং শার্লি চিশলমের সাথে তিনি ন্যাশনাল উইমেনস পলিটিক্যাল ককাস প্রতিষ্ঠা করেন। একই বছর তিনি 'এমএস' ম্যাগাজিন চালু করেন, যার প্রথম সংখ্যাটি মাত্র আট দিনে ৩ লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। তিনি 'নিউ ইয়র্ক' ম্যাগাজিনেরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি ইকুয়াল রাইটস অ্যামেন্ডমেন্টের সমর্থনে সিনেটে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি পুরুষতান্ত্রিক মিথের সমালোচনা করে বলেছিলেন যে, এটি একটি দ্বিদলীয় সমস্যা।
স্টেইনম তার দীর্ঘ কর্মজীবনে পেন-মিসৌরি জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড, ন্যাশনাল ম্যাগাজিন অ্যাওয়ার্ড এবং জাতিসংঘ প্রদত্ত সোসাইটি অফ রাইটার্স অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। ২০১৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাকে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম প্রদান করেন। তিনি ২০১৯ সালে তার শেষ বই 'দ্য ট্রুথ উইল সেট ইউ ফ্রি, বাট ফার্স্ট ইট উইল পিস ইউ অফ!' প্রকাশ করেন।
২০০০ সালে ৬৬ বছর বয়সে তিনি ডেভিড বেইলকে বিয়ে করেন, তবে তিন বছর পর বেইল মারা যান। স্টেইনমের কোনো জৈবিক সন্তান ছিল না। জীবনের শেষভাগে তিনি এলজিবিটি অধিকার এবং বিশ্বজুড়ে নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ছিলেন। ২০১১ সাল থেকে তিনি ফ্রন্টলাইন উইমেনস ফান্ডের সহ-আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করেছেন। তার নিউইয়র্কের আপার ইস্ট সাইডের বাসভবনটি ছিল বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ এবং চিন্তাবিদদের মিলনস্থল। ২০২৪ সালে বিবিসি পডকাস্টে তিনি বলেছিলেন, তিনি আশা করেন তার উত্তরাধিকার মানুষকে তাদের নিজেদের মতো করে অনন্য ও মূল্যবান মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে।

