চীনের অর্থনৈতিক বিস্ময়ের অবসান নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে বহু বছর ধরেই নানা নেতিবাচক পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত বিনিয়োগ, বিশাল ঋণ, আবাসন খাতের ধস, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন কিংবা মধ্যবিত্তের গণতন্ত্রের দাবির মতো বিষয়গুলোকে চীনের আসন্ন পতনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি যারা চীনের দ্রুত প্রবৃদ্ধির প্রশংসা করেছেন, তারাও এমনটা ভেবেছিলেন যে পশ্চিমা বিশ্ব উন্নত প্রযুক্তির উৎপাদন শিল্পে আধিপত্য বজায় রাখবে, আর চীন কেবল সস্তা টিভি বা সাধারণ পণ্য তৈরির কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে বাস্তবতা হলো, চীন এখন বিশ্বের কারখানা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
চীনের এই অগ্রযাত্রা দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম ধাপে সস্তা শ্রমের সুবিধা নিয়ে তারা কম খরচের পণ্য উৎপাদনে মনোযোগ দেয়। সেই সময় চীন ১.০-এর উত্থান না ঘটলে ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো নিউইয়র্কের একজন সাধারণ প্রপার্টি ডেভেলপার হিসেবেই থেকে যেতেন এবং ব্রেক্সিটের মতো ঘটনা হয়তো ঘটত না। তবে চীন কেবল সস্তা পণ্যের উৎপাদক হয়ে থাকতে চায়নি। চীন ২.০ পর্যায়টি সেই ধারণা ভেঙে দেয়। তারা উচ্চমানের উৎপাদন শিল্পে বিশাল বিনিয়োগ শুরু করে। সোলার প্যানেল বাজারে তারা একক আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে এখন বিশ্বনেতা। এমনকি জার্মানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তারা এখন নিজেরাই উন্নত যন্ত্রাংশ তৈরি করতে সক্ষম। জার্মানির 'অল্টারনেটিভ ফুর ডয়েচল্যান্ড'-এর মতো উগ্র ডানপন্থী দলের উত্থানের পেছনে চীনের এই শিল্প সক্ষমতা বড় একটি কারণ।
অবশ্য চীনের এই মডেলে কিছু ঘাটতিও রয়েছে, যা সমালোচকদের নজরে এসেছে। দেশটির অর্থনীতি অতিরিক্ত বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল এবং চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অনেক বেশি। অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম থাকা এবং কল্যাণমূলক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে চীনকে তার উদ্বৃত্ত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে হয়। সম্প্রতি জি-২০ বৈঠকে চীনের এই নীতির কারণে দেশটি কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে ব্যর্থ হওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
তবে চীন এখন এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেমেছে। একে বলা হচ্ছে 'চীন ৩.০'। ইউনিক্রেডিটের এডুয়ার্ডো ক্যাম্পানেলার মতে, বেইজিং একটি স্পষ্ট কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে—প্রযুক্তির অগ্রভাগে থাকা, বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজস্ব মডেল ছড়িয়ে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মান নির্ধারণ করা। ক্যাম্পানেলার ভাষায়, এই কৌশল সফল হলে তা কেবল বিশ্ব অর্থনীতি নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকেও বদলে দিতে পারে।
এআই প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতায় তিনটি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, ওয়াশিংটন যখন তার মিত্র দেশগুলোর ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করছে, তখন এটি তাদের জন্য সবচেয়ে খারাপ সময়; যুক্তরাষ্ট্রের এখন মিত্রদের প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, চীনের বিনামূল্যে পাওয়া এআই মডেলগুলো বিশ্ব বাজারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, যা এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রযুক্তির আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল। সবশেষে, চীনের শিল্পায়নের পরিকল্পনা থেকে ব্রিটেনের মতো দেশগুলোর শিক্ষা নেওয়ার আছে। চীন কোনো অলীক স্বপ্ন না দেখে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে এবং ভর্তুকি, শুল্ক, বিনিময় নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মতো সব ধরনের নীতিগত টুল ব্যবহার করে আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছে। চীনের মডেলের সীমাবদ্ধতা থাকলেও, ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে ব্রিটেনের অবহেলার তুলনায় চীনের শিল্পায়নের প্রতি একাগ্রতা স্পষ্টভাবেই আলাদা।

