ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এখন দেখা যাচ্ছে শিল্পকলার ইতিহাসে যুদ্ধের অন্যতম সেরা এক চিত্রায়ণ—‘বায়ো টাপেস্ট্রি’ (Bayeux Tapestry)। গ্যালারিজুড়ে একটি দীর্ঘ কাঁচের বাক্সে অত্যন্ত যত্ন সহকারে এটি প্রদর্শন করা হচ্ছে। প্রদর্শনীতে প্রবেশের আগে দর্শকরা প্রাচীন বর্ম, ঐতিহাসিক নথির উদ্ধৃতি এবং তথ্যবহুল স্ক্রিন দেখার সুযোগ পান। এরপরই অন্ধকার ঘরের সুবিন্যস্ত আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এই ঐতিহাসিক লিনেন কাপড়টি, যা দর্শকদের নিয়ে যায় হাজার বছর আগের এক রোমাঞ্চকর ও নির্মম ইতিহাসের দোরগোড়ায়।
১০৬৬ সালের ১৪ অক্টোবর অ্যাংলো-স্যাক্সন ইংল্যান্ডের সদ্য মুকুট পরা রাজা হ্যারল্ড এবং নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়ামের সদ্য অবতরণ করা বাহিনীর মধ্যে হেস্টিংসের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। দিনশেষে রাজা হ্যারল্ড এবং তাঁর অসংখ্য সৈন্য নিহত হন, যার ফলে নরম্যানরা ইংল্যান্ড জয় করে। এই যুদ্ধ একটি জাতির ইতিহাস চিরতরে বদলে দিয়েছিল। পরবর্তীতে স্পেনের দ্বিতীয় ফিলিপ, নেপোলিয়ন বা হিটলারের মতো বিশ্বজয়ী শাসকেরা যেখানে ইংল্যান্ড আক্রমণ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেখানে উইলিয়াম সফল হয়েছিলেন।
কাপড়ের এই সুদীর্ঘ ফালিতে যুদ্ধের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সংঘাতের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দর্শকরা যখন এই প্রদর্শনীর পাশ দিয়ে হেঁটে যান, তখন তারা দেখতে পান এক ভৃত্যের আড়ি পেতে কথা শোনার দৃশ্য কিংবা রাজা হ্যারল্ডের এক সহচরের শিকারি কুকুরকে কোলে করে জাহাজে তুলে নেওয়ার চমৎকার বিবরণ, যাতে কুকুরের থাবা ভিজে না যায়। এরপর যখন যুদ্ধ শুরু হয়, নরম্যান অশ্বারোহী বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণ এবং স্যাক্সনদের কুড়াল হাতে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এক পর্যায়ে মনে হয় উইলিয়াম বুঝি হেরেই যাচ্ছেন, যেখানে ঘোড়া উল্টে পড়ছে এবং বর্ম পরিহিত নাইটরা অসহায়ভাবে আছড়ে পড়ছে মাটিতে।
এই টাপেস্ট্রিতে গতির এমন এক অসাধারণ প্রকাশ ঘটেছে যা গতিশীল আলোকচিত্রের অগ্রদূত ইডওয়ার্ড মাইব্রিজের মোশন সিকোয়েন্সের কথা মনে করিয়ে দেয়। দুই বার্তারাহকের বাতাসে ওড়া সোজা কালো সুতোর মতো চুল কিংবা হেস্টিংসের যুদ্ধে নরম্যান ঘোড়াগুলোর ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে কদমে কদমে ছুটে চলার দৃশ্য সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মূল কাহিনীর সমান্তরালে কাপড়ের ওপর ও নিচের সীমানায় (বর্ডার) রয়েছে কাল্পনিক দানব, ড্রাগন ও শিকারি পাখির চিত্র। এমনকি ওপরের বর্ডারে মহাকাশের হ্যালির ধূমকেতুকে রকেটের মতো ছুটে যেতে দেখা যায়, যা মহাজাগতিক এক আবহ তৈরি করে।
যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝেও সাধারণ কৃষকদের জমিতে হাল চাষ ও বীজ বপনের মতো বাস্তব চিত্র এখানে স্থান পেয়েছে, যা মনে করিয়ে দেয় যে শাসক যেই হোক না কেন, সাধারণ মানুষকে তাদের জীবিকার কাজ চালিয়ে যেতেই হয়। একটি দৃশ্যে এক নারী ও শিশুকে তাদের ঘর পুড়তে দেখার এবং ঘর পুড়িয়ে দেওয়া এক নরম্যান সৈন্যের বিষণ্ণ ও অপরাধবোধে জর্জরিত অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রায় ৪০ মিনিটের এই প্রদর্শনী দর্শকদের যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি—তীরবিদ্ধ হয়ে রাজা হ্যারল্ডের পতন, মৃতদেহের স্তূপ এবং শেষ দৃশ্যে সাধারণ মানুষের মৃত সৈন্যদের বর্ম খুলে নেওয়ার দৃশ্য দেখানোর মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক নিদর্শনই নয়, বরং যুদ্ধের উন্মাদনা ও নির্মমতার এক শাশ্বত দলিল।

