বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একাকীত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নজিরবিহীনভাবে বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সোশ্যাল কানেকশন কমিশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের ১৭ থেকে ২১ শতাংশই একাকীত্বে ভুগছেন, যা অন্য যেকোনো বয়সগ্রুপের চেয়ে বেশি। এছাড়া ৩৮টি দেশের ১০ লাখেরও বেশি তরুণের ওপর পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যুব সমাজের একাকীত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতেও এই প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনির স্কুল অব পাবলিক হেলথের সোশ্যাল হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং গ্রুপের প্রধান এবং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ড. মিশেল লিম তাঁর নতুন বই ‘দ্য লোনলি জেনারেশন’-এ এই সংকটের গভীরতা বিশ্লেষণ করেছেন। ডব্লিউএইচও-এর একাকীত্ব বিষয়ক উপদেষ্টা প্যানেলের সদস্য এবং ‘এন্ডিং লোনলিনেস টুগেদার’ ক্যাম্পেইনের প্রধান নির্বাহী ড. লিম বলেন, বিগত কয়েক দশকে শৈশব ও কৈশোরের ধরন নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। তাঁর মতে, আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলছি যেখানে মানুষ একা থাকতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, যাকে তিনি ‘সোশ্যাল অ্যাট্রোফি’ বা সামাজিক জড়তা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ২০২০ সালে বৈশ্বিক স্তরে একাকীত্ব ও সামাজিক যোগাযোগ নিয়ে কাজ করতে তিনি ‘গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন লোনলিনেস অ্যান্ড কানেকশন’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখন ছয়টি মহাদেশে বিস্তৃত।
ড. লিম এই একাকীত্ব বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব, কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ধাক্কা, ছোট পরিবার গঠন, সামাজিক মেলামেশার উন্মুক্ত জায়গার অভাব, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, হাইব্রিড কর্ম ও শিক্ষাপদ্ধতি, ধর্মের প্রভাব হ্রাস এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির (অটোমেশন) ব্যবহার। উদাহরণস্বরূপ, সুপারমার্কেটে গিয়ে এখন কোনো মানুষের সাথে কথা না বলেই কেনাকাটা শেষ করা সম্ভব।
শিক্ষাব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে ড. লিম লিখেছেন, বর্তমান পদ্ধতি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যকে অগ্রাধিকার দেয়, যার একটি অদৃশ্য বড় মাশুল দিতে হচ্ছে। অতিরিক্ত কোচিং ও পরীক্ষার চাপে শিশুরা নিজেদের মতো সময় কাটানো বা খেলার সুযোগ পাচ্ছে না, যা তাদের সামাজিক দক্ষতা ও নিজস্ব পরিচয় গঠনে বাধা দিচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আমরা হয়তো পড়াশোনায় ভালো প্রজন্ম তৈরি করছি, কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার মতো দক্ষতা তাদের তৈরি হচ্ছে না।
সিডনির ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী উষা মাক্কেনা এই মতামতের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। অস্ট্রেলিয়ার তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক দাতব্য সংস্থা ‘হেডস্পেস’-এর জাতীয় রেফারেন্স গ্রুপের এই সদস্য জানান, কৈশোরের শেষের দিকে তিনি তীব্র একাকীত্বে ভুগতেন। ব্যস্ত জীবন ও নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর এই অনুভূতি দূর হয়নি। তিনি বলেন, অর্থপূর্ণ যোগাযোগ গড়ে ওঠে মূলত অসংগঠিত ও সাধারণ অলস সময়ে, যা ব্যস্ততার কারণে হারিয়ে যায়।
অন্যদিকে জিম্বাবুয়ে থেকে সিডনিতে পড়তে আসা ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নেনিয়াশা ডোঙ্গো জানান, ক্লাস শেষে বাসায় ফিরেও তিনি তীব্র একাকীত্ব অনুভব করেন। কারণ তাঁর ফ্ল্যাটমেটরা সবাই নিজেদের ঘরে বন্দি থাকেন। তিনি বলেন, "চারপাশে শুধু নীরবতা। আপনাকে কেবল এতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে হবে।" শ্রীলঙ্কা থেকে আসা ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মিহিন্দি প্যাথিনায়াকে বলেন, এখনকার দিনে সামাজিক যোগাযোগের ধরন বদলে গেছে। অনেক সময় ইনস্টাগ্রাম আইডি আদান-প্রদান হলেও পরে আর কোনো যোগাযোগ হয় না। উষা মাক্কেনাও মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের বন্ধুত্ব বা সামাজিক জীবন দেখে নিজের একাকীত্ব আরও তীব্র মনে হতে পারে।
প্রযুক্তি সম্পর্কে ড. লিম বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া সম্পূর্ণ ক্ষতিকর নয়, এটি অনেক সময় বিচ্ছিন্ন সম্প্রদায়ের তরুণদের যুক্ত হতে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত ভার্চুয়াল যোগাযোগের ফলে মানুষ বাস্তব জীবনের জটিলতা এড়াতে চায়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে হয়তো তরুণরা মানুষের চেয়ে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) অবতারকে নিজেদের সবচেয়ে ভালো বন্ধু মনে করবে, যা এখনই তাঁর ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে দেখা যাচ্ছে, যেখানে অনেক তরুণ-তরুণী বাস্তবে কখনো দেখা না হওয়া মানুষের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়াচ্ছে।
একাকীত্বের এই চক্রকে ড. লিম ‘লোনলিনেস লুপ’ বা একাকীত্বের ফাঁদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যেখানে একাকীত্ব মানুষকে সামাজিক যোগাযোগকে হুমকিস্বরূপ মনে করতে বাধ্য করে, ফলে তারা আরও গুটিয়ে যায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে একাকীত্ব দূর করার জন্য বিভিন্ন অ্যাপ বা পেইড সার্ভিস কিনতে হচ্ছে, যা আমাদের সামাজিক কাঠামোর ক্ষয়কেই নির্দেশ করে। ড. লিমের মতে, একাকীত্ব একটি সংকেত এবং এই সংকটের সমাধান কেবল ব্যক্তির নয়, পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

