অপরাধ ও হুমকি মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। সংস্থাটির উপ-পরিচালক ক্রিস্টোফার রাইয়া সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এআই প্রযুক্তির সহায়তায় এখন অনেক দ্রুত বিশ্বাসযোগ্য হুমকিগুলো শনাক্ত করা যাচ্ছে। এর ফলে কোনো গোপন তথ্য পাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সময় কয়েক সপ্তাহ থেকে কমে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বা মিনিটে নেমে এসেছে।
এফবিআই-এ ২৩ বছর ধরে কর্মরত ক্রিস্টোফার রাইয়া গত জানুয়ারি মাসে উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। তিনি বলেন, "আমরা তদন্ত প্রক্রিয়ায় এআই যুক্ত করেছি। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সবার আগে সামনে চলে আসে এবং আমরা দ্রুত মাঠপর্যায়ে পদক্ষেপ নিতে পারি।" এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এফবিআই-এর ন্যাশনাল থ্রেট অপারেশনস সেন্টার এখন দ্রুততম সময়ে সবচেয়ে বড় হুমকিগুলো চিহ্নিত করতে পারছে।
এআই ব্যবহারের একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে রাইয়া জানান, গত মার্চ মাসে নর্থ ক্যারোলাইনার নিউপোর্টের বাসিন্দা জ্যাকারি চার্লস নিউয়েলকে ফেডারেল কারাগারে দুই বছরের সাজা দেওয়া হয়। তিনি অনলাইনে একটি কৃষ্ণাঙ্গ প্রিস্কুলে গুলি চালানো এবং শিশুদের ক্ষতি করার হুমকি দিয়েছিলেন। সাধারণত এই ধরনের তথ্য যাচাই করে ব্যবস্থা নিতে এফবিআই-এর কয়েক দিন বা সপ্তাহ লেগে যেত। কিন্তু এআই প্রযুক্তির সহায়তায় এই তথ্যটি তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বের তালিকায় সবার ওপরে চলে আসে এবং দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এফবিআই-এর বার্ষিক অপরাধ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে হত্যাকাণ্ডের হার গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রে রেকর্ড এক বছরের সর্বোচ্চ হ্রাস দেখা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুরুতর হামলা ৭.২ শতাংশ, ধর্ষণ ৭.৬ শতাংশ এবং ডাকাতির ঘটনা ১৮.৫ শতাংশ কমেছে। ক্রিস্টোফার রাইয়া অপরাধের এই নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা, সীমান্ত সিল করে দেওয়া এবং সহিংস অপরাধ দমনে নতুন করে জোর দেওয়ার মতো একাধিক বিষয়ের সমন্বয়কে কৃতিত্ব দিয়েছেন।
বিপুল পরিমাণ ডেটা বা তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এফবিআই আগে যে জনবল সংকটে পড়ত, তা এআই কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে বলে জানান রাইয়া। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন হাজার হাজার গোপন তথ্য আসে। আগে এগুলো বিশ্লেষণ করার মতো পর্যাপ্ত জনবল ছিল না, যার ফলে অনেক ঝুঁকি জমে থাকত। এখন এআই অ্যালগরিদম এই কাজ সহজ করে দিয়েছে।
তবে এআই-এর ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মীরা। এ বিষয়ে রাইয়া আশ্বস্ত করে বলেন, নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় এফবিআই কংগ্রেস এবং অন্যান্য তদারকি বোর্ডের সাথে স্বচ্ছতা বজায় রেখে কাজ করছে। তিনি জানান, গত দেড় বছরে পর্যালোচনার জন্য প্রায় ৫০,০০০ পৃষ্ঠার নথি পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, "আমরা কোনোভাবেই মার্কিন নাগরিকদের গোপনীয়তা বা নাগরিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছি না।"
এদিকে, 'ফ্লক সেফটি' নামক একটি কোম্পানির স্বয়ংক্রিয় লাইসেন্স প্লেট রিডার ক্যামেরা ব্যবহারের ফলে গোপনীয়তা লঙ্ঘনের উদ্বেগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রাইয়া জানান, তদন্তের সূত্র মেলাতে এবং অপরাধীদের খুঁজে বের করতে এই ক্যামেরাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৬,০০০ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই ক্যামেরা ব্যবহার করছে এবং তাদের সংগৃহীত তথ্য ফেডারেল সংস্থাগুলোর সাথে শেয়ার করা হয়।
সাক্ষাৎকারে ক্রিস্টোফার রাইয়া ট্রাম্প প্রশাসনের মাদক কার্টেল এবং আন্তর্জাতিক গ্যাং বিরোধী উদ্যোগ নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে গঠিত 'হোমল্যান্ড সিকিউরিটি টাস্ক ফোর্স' এফবিআই-এর সাথে অন্যান্য সংস্থার সমন্বয় আরও বাড়িয়েছে। এর আওতায় গত আগস্ট মাসে পুয়ের্তো রিকোর একটি সহিংস গ্যাংয়ের ৮১ জন অভিযুক্ত সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক পাচার এবং অস্ত্র আইনের লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

