ভারতীয় ক্রিকেটে এমন কিছু তারকা থাকেন যারা হয়তো সবসময় স্পটলাইটে থাকেন না, কিন্তু দলের প্রয়োজনে সবসময় ঢাল হয়ে দাঁড়ান। আজিঙ্কা রাহানে তেমনই একজন ক্রিকেটার, যিনি নীরবেই নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন এবং ভারতের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা সংকটের কাণ্ডারি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এক দশকের দীর্ঘ টেস্ট ক্যারিয়ারে রাহানে কখনোই ভারতীয় ব্যাটিং লাইনেআপের একমাত্র স্তম্ভ ছিলেন না, তবে বিদেশের মাটিতে তিনি ছিলেন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটারদের একজন। নিয়মিত অধিনায়ক না হলেও, যখনই মূল অধিনায়ক অনুপস্থিত থাকতেন, তখনই তার কাঁধে উঠত নেতৃত্বের ভার। তিনি এমন এক চরিত্র ছিলেন যিনি নিজের চেয়ে সবসময় দলকে এগিয়ে রেখেছেন।
যখনই ভারতীয় দল কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, তখনই ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন রাহানে। ২০১৪ সালের লর্ডস টেস্টের কথা ধরা যাক। পঞ্চম দিনে ইশান্ত শর্মার বাউন্সার ঝড়ে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছিল ভারত। কিন্তু তার আগে প্রথম দিনে যখন দল ১৪৫ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল, তখন রাহানের লড়াকু সেঞ্চুরিই ভারতকে লড়াইয়ে ফিরিয়েছিল। এটি ছিল এমন এক ক্যারিয়ারের নিখুঁত উদাহরণ যা দলের জন্য লড়াই করাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিত।
এর ছয় বছর পর, ২০২০ সালে মেলবোর্নে আরও বড় দায়িত্ব আসে তার কাঁধে। অ্যাডিলেডে মাত্র ৩৬ রানে অলআউট হওয়ার লজ্জার পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হন। সেই কঠিন সময়ে মেলবোর্নে তার দুর্দান্ত সেঞ্চুরি ভারতকে এক ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের পথ দেখায়, যার সমাপ্তি ঘটেছিল গ্যাবায় অস্ট্রেলিয়ার দুর্গ ভাঙার মাধ্যমে। কোনো আড়ম্বর ছাড়াই শান্ত মাথায় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী তিনি কখনো পাল্টা আক্রমণ করেছেন, আবার কখনো রক্ষণাত্মক ব্যাটিংয়ে উইকেট সামলেছেন।
দেশের মাটিতেও রাহানের অবদান কম ছিল না। ২০১৫ সালের দিল্লি টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুই ইনিংসে দুটি সেঞ্চুরি করে ম্যাচ ভারতের নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন। ২০১৬ সালে ইন্দোরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছিলেন নিজের ক্যারিয়ার সেরা ১৮৮ রানের ইনিংস। সেই ইনিংসের পর তিনি বলেছিলেন, "কঠিন সময়ে লড়াই করাটা উপভোগ করা জরুরি। শুধু রান পেলেই ব্যাটিং উপভোগ করব তা নয়, কঠিন পরিস্থিতি কীভাবে সামলানো যাচ্ছে সেটাও উপভোগ করা উচিত।"
তবে ক্যারিয়ারের শেষভাগে এসে অফ-স্টাম্পের বাইরের দুর্বলতা এবং মনঃসংযোগের অভাব তার ব্যাটিংয়ে প্রভাব ফেলে। ২০২১ সালে ২৩ ইনিংসে মাত্র দুটি হাফ সেঞ্চুরি করার পর ২০২২ সালের শুরুতে তাকে দল থেকে বাদ দেয় বিসিসিআই। তবে দমে যাননি রাহানে। ২০২২-২৩ রঞ্জি ট্রফিতে ১১ ইনিংসে ৫৭.৬৪ গড়ে ৬৩৪ রান করে আবার জাতীয় দলে ফেরেন। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে দলের হয়ে সর্বোচ্চ রানও করেন তিনি। কিন্তু এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে রান না পাওয়ায় নির্বাচকরা তাকে স্থায়ীভাবে দল থেকে বাদ দেন।
মুম্বাইয়ের ঐতিহ্যবাহী ব্যাটিং ঘরানা থেকে উঠে আসা রাহানে ভারতের হয়ে টেস্টে ৫,০৭৭ রান করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ১২টি সেঞ্চুরি ও ২৬টি হাফ সেঞ্চুরি এবং গড় ৩৮.৪৬। বিদায় বেলায় আবেগময় বার্তায় তিনি বলেন, "আমি একটি সহজ নিয়ম মেনে চলেছি: সবসময় নিজের চেয়ে দেশ এবং দলকে এগিয়ে রেখেছি।" ভারতীয় ক্রিকেটে রাহানের অবদান রান বা গড় দিয়ে পুরোপুরি পরিমাপ করা যাবে না, বরং দলের প্রতি তার নিঃস্বার্থ নিবেদনই তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

