একটা সময় ছিল যখন বিয়েবাড়ির আয়োজন মানেই ছিল এলাহি কাণ্ড। কিন্তু এখন সেই জায়গা দখল করে নিচ্ছে জন্মদিন। মার্ডার-মিস্ট্রি ট্রিপ থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট ড্রেস কোড ও নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্যসহ মিনি-ফেস্টিভ্যালের আয়োজন এখন অনেকের কাছেই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই বিশাল আয়োজন কি কেবলই নিজেদের জাহির করার অহংকার, নাকি বিচ্ছিন্ন হতে থাকা এই যুগে মানুষের সাথে সংযোগ খোঁজার এক মরিয়া চেষ্টা?
প্রতি বছর আগস্টের সরকারি ছুটির সপ্তাহান্তে কর্নিশ উপকূলের এক বিশাল বাগানে সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় ‘মাইকফেস্ট’। আমন্ত্রিত অতিথিরা তাদের সবচেয়ে জমকালো পোশাক পরে তাঁবু নিয়ে হাজির হন। সেখানে বিলি করা হয় বার্থডে বয় মাইকেলের মুখচ্ছবি আঁকা মাস্ক, হাতপাখা এবং প্রত্যেকের নাম লেখা ব্র্যান্ডেড সিপি কাপ। এরপর শুরু হয় বাধ্যতামূলক ট্যালেন্ট শো-সহ নানা আয়োজন, যেখানে মাইকেল নিজেই তার নাচের মাধ্যমে সবসময় প্রথম পুরস্কার জিতে নেন। মাইকেলের বয়স কিন্তু ১০ বছর নয়, তিনি এখন ৪৪ বছরে পা দিতে চলেছেন। নিজেকে ‘বার্থডেজিলা’ হিসেবে স্বীকার করতে তার কোনো দ্বিধা নেই। জন্মদিনে আসতে না পারা বন্ধুদের তিনি যেমন অপরাধবোধে ভোগান, তেমনি টানা দুই বছর যারা এই উৎসবে যোগ দেননি, তাদের ভবিষ্যতের জন্য নিষিদ্ধও করে দেন। তবে নিজের স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে মাইকেল বলেন, ‘আজকাল উদযাপন করার মতো তেমন কিছু নেই, মানুষকে একসাথে করাও কঠিন। তাই জন্মদিনের ব্যাপারে আমি একটু কঠোর। আমি এমন একটি জীবন ও প্রিয়জনদের বলয় তৈরি করেছি যা আমি পছন্দ করি, তাহলে কেন তা নিয়ে মেতে উঠব না? বছরে একবার আমার জন্য তাদের উপস্থিতি আশা করা তো খুব বেশি কিছু নয়।’
একসময় কেবল এক টুকরো কেক কেটেই জন্মদিন পার করে দেওয়া যেত, কিন্তু এখন বন্ধুদের নিয়ে বড় পার্টি, বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটি বা বিদেশে দলবেঁধে ঘুরতে যাওয়ার চল শুরু হয়েছে। এডিনবরার ২৯ বছর বয়সী তরুণী লরেন জানান, বন্ধুদের জন্মদিনের পেছনে ছুটতে গিয়ে তার বার্ষিক ছুটির কোটা শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘এই বছর আমি আটটি ৩০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছি। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ আয়োজনটি ছিল একটি প্রাইভেট ড রুমে ডিনার, যার পেছনেও আমার ১০০ পাউন্ড খরচ হয়েছে। এছাড়া স্কটল্যান্ডের একটি দুর্গে মার্ডার-মিস্ট্রি উইকএন্ড, বার্থডে গার্লকে নিয়ে কুইজ শো, মার্সেইতে লাইভ মিউজিক এবং সালসা নাচ ও কারাওকে পার্টিতে অংশ নিয়েছি। এতে আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একজনকে হ্যাঁ বললে অন্যজনকে না বলা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন মনে হয় নিজের জন্মদিনে আমিও এমন বড় কিছু আয়োজন করে উশুল করে নেব, আর এভাবেই আমিও এই সমস্যার অংশ হয়ে উঠছি।’
লরেন খুব কাছ থেকে দেখেছেন কীভাবে একটি জন্মদিন একজন মানুষকে অত্যাচারী করে তুলতে পারে। তার এক স্কুলবান্ধবীর ‘জন্মদিনের মাস’ চলাকালীন লরেন নিজের গর্ভবতী হওয়ার খবর জানানোয় সেই বান্ধবী তার ওপর ক্ষিপ্ত হন, যার ফলে তাদের বন্ধুত্ব এখন সুতোয় ঝুলছে। লরেন বলেন, ‘আমাদের প্রজন্মের মধ্যে নিজেদের সামাজিক প্রোফাইলের তারকা ভাবার একটা প্রবণতা কাজ করে। আমরা সবাই মনোযোগ পেতে পছন্দ করি, কিন্তু আমার মনে হয় আমরা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছি। সব বড় আয়োজন কেবল দেখানোর জন্য নয়, তবে অনেকগুলোই তাই। আর তখনই অতিথিদের সময় ও অর্থের অপচয়টা গায়ে লাগে।’
জন্মদিন মানুষের কাছে অত্যন্ত আবেগঘন একটি বিষয় কারণ এটি জীবনের একটি আয়না হিসেবে কাজ করে। মার্কিন ইতিহাসবিদ হাওয়ার্ড পি চুডাকফ তার ১৯৮৯ সালের ‘হাউ ওল্ড আর ইউ?’ বইয়ে লিখেছেন, জন্মদিন হলো এমন এক মাইলফলক যার মাধ্যমে মানুষ একই বয়সের অন্যদের সাথে নিজের অবস্থান, অর্জন ও চেহারার তুলনা করে। এটি অনেকটা ট্রেনের মতো—আপনি কি সময়ের চেয়ে এগিয়ে আছেন, সঠিক সময়ে আছেন নাকি পিছিয়ে আছেন? কারও কাছে এটি নীরবে পার করার দিন, আবার কারও কাছে প্রিয়জনদের কাছে টানার উপলক্ষ। এক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্যও রয়েছে; ‘ইউগভ’-এর এক জরিপ অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় নারীরা বড় জন্মদিনকে উদযাপনের সুযোগ হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে দ্বিগুণ এগিয়ে। মাইকেলের মতে, পুরুষদের মধ্যে নিজের বিশেষ দিনে সবার উপস্থিতি চাওয়া বা পার্টির আয়োজন করাকে ‘পুরুষোচিত নয়’ ভাবার এক পুরোনো মানসিকতা কাজ করে। তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি জেনারেশনের ক্ষেত্রে; বিশেষ করে ২০, ৩০ ও ৪০ বছর বয়সীরাই তাদের জন্মদিনকে বড় ইভেন্ট হিসেবে দেখছেন।
ক্রিশা নামে এক তরুণী তার এক নতুন বন্ধুর জন্মদিনে ডোমিনিকান রিপাবলিকে এক সপ্তাহের জন্য হাইকিং, সাফারি, ঘোড়সওয়ারি ও ম্যাসাজের জন্য উড়াল দিয়েছিলেন। বাড়ি কেনার জন্য টাকা জমানো যখন অসম্ভব মনে হয়, তখন জীবনের স্মরণীয় কোনো অভিজ্ঞতার পেছনে খরচ করাকে তিনি যৌক্তিক মনে করেন। তবে সমাজের দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আমি যখন মানুষকে বলি যে একটি জন্মদিনের জন্য আমি বিশ্বভ্রমণ করেছি, সবাই বলে এটা পাগলামি। কিন্তু বিয়ের জন্য এমনটা করলে কেউ প্রশ্ন তোলে না।’
মানুষের খরচের খাতগুলো বদলে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ যদি এই খরচ বহন করতে না পারে তখন কী হয়? মিডল্যান্ডসের পলি তার বন্ধুর বারবার পাঠানো আমন্ত্রণগুলো নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। তার বন্ধুর ৪০তম জন্মদিনের জন্য পর্তুগাল ভ্রমণ থেকে শুরু করে পাবের আড্ডা—সারা বছর জুড়ে নানা পরিকল্পনা ছিল। পলি বলেন, ‘আমার জন্য এটা অনেক বড় আর্থিক চাপ ছিল। আমি যে এত খরচ করতে পারব না, তা বান্ধবীকে বলতে গিয়ে আমার ভীষণ উদ্বেগ হচ্ছিল। এখন আমার মনে হয় আমি তার ধনী বন্ধুদের চেয়ে আলাদা স্তরে পড়ে গেছি। তার “কোনো চাপ নেই” মন্তব্যগুলো যে আমাকে উদ্দেশ্য করেই করা হয়, তা আমি বুঝতে পারি এবং নিজেকে গ্রুপের দরিদ্র বন্ধু মনে হয়।’ পলি নিজে ব্যক্তিগতভাবে ছোটখাটো আয়োজন, যেমন একটু আড্ডা বা একটি সুন্দর কার্ড আদান-প্রদানকেই যথেষ্ট মনে করেন।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্মদিনের পার্টির ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। প্রাচীন মিশরে ফারাওদের ভোজের প্রমাণ থাকলেও পশ্চিমে ১৯০০ সালের দিকে ধনীদের সামাজিক মর্যাদা দেখানোর উপায় হিসেবে এটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ‘মডার্ন ফ্রেন্ডশিপ: হাউ টু নার্চার আওয়ার মোস্ট ভ্যালুড কানেকশনস’ বইয়ের লেখক ও বন্ধুত্ব বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যানা গোল্ডফার্ব বলেন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই জাঁকজমকপূর্ণ উদযাপনকে মূলধারায় নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দাদা-দাদিরা বাড়িতেই পরিবারের সাথে জন্মদিন কাটাতেন। কিন্তু ৭০ ও ৮০-এর দশকে সিনেমা হল বা ফাস্ট-ফুড চেইনের মতো শহরতলির ব্যবসাগুলো মুনাফা বাড়াতে বাচ্চাদের জন্মদিনের পার্টির অফার দেওয়া শুরু করে। সেই বাচ্চারা বড় হয়েই ভাবতে শুরু করে যে জন্মদিন মানেই সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া। এমটিভির “মাই সুপার সুইট সিক্সটিন”-এর মতো জনপ্রিয় সংস্কৃতিগুলো এই ধারণাকে আরও উসকে দিয়েছে।’ এছাড়া বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার ঐতিহ্য যেমন ‘বার ও ব্যাটমিটসভাহ’ বা ‘কুইনসিনেরা’র সাথেও বড় পার্টির সংযোগ রয়েছে।
এর সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যুক্ত হওয়া যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করেছে। দুয়া লিপার চার্টার্ড ইয়াটে ৩০তম জন্মদিন উদযাপন বা ক্রিস জেনারের ৭০তম জন্মদিনে ব্রুনো মার্সের গান গাওয়ার মতো অতি-ধনীদের জাঁকজমক দেখে সাধারণ মানুষের সাধারণ পিকনিকের পরিকল্পনাও ম্লান হয়ে যায়। ব্রাইটনের ফটোগ্রাফার টম জানান, তিনি এমন অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে জন্মদিনে ভেঙে পড়তে দেখেছেন যারা খারাপ মানুষ নন, কিন্তু দিনটি কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরণের জেদ কাজ করে। সম্প্রতি একটি পার্টিতে কাজ করার সময় এক নারী তার প্রবেশপথের দৃশ্যটি তিনবার রিটেক করেন কারণ উপস্থিত অতিথিরা যথেষ্ট জোরে চিৎকার করেননি। তিনি মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে চিৎকার করে বলেন, ‘টিকটকে এটা দেখতে বাজে লাগবে, আবার করো।’
কিছু ‘বার্থডে ডিভা’দের আচরণ সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে। অলিভারের কাজিন তার গার্ডেন পার্টিটি নিখুঁত করতে গিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে রীতিমতো অত্যাচার শুরু করেছিলেন। তিনি সবার পোশাকের ছবি দেখতে চান এবং নির্দেশনা দেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন পার্টির আগের দিন তিনি মেসেজ পাঠিয়ে জানান যে ফুলের সাজসজ্জা ও শামিয়ানার খরচ অনেক বেশি হয়ে গেছে, তাই সবাইকে ৫০ পাউন্ড করে নগদ টাকা দিতে হবে। অলিভার বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত সস্তা ছিল এবং সবার মেজাজ খারাপ করে দিয়েছিল। যদিও ছবিতে আমাদের হাসিমুখ দেখা গেছে, কিন্তু পুরো বিষয়টি আমাদের মনে একটি তেতো স্বাদ রেখে গেছে।’
অন্যদিকে আমিনা তার এক কাছের বন্ধুর ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন কারণ সে তার জন্মদিনে দেরিতে এসেছিল এবং তার বয়স মনে রাখতে পারেনি। কিন্তু পরে আমিনার মনে পড়ে, যখন তার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা ছিল না, তখন এই বন্ধুই দূর থেকে ফোন করে ক্যাফেতে তার জন্য চা ও সিঙ্গারা পাঠিয়েছিল। আমিনা বুঝতে পারেন, একেকজন মানুষ একেকভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করে। গোল্ডফার্বের মতে, আগে বন্ধুত্ব ছিল পারস্পরিক সাহায্য ও প্রতিবেশীদের সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু এখন আমরা উবার বা বিড়াল দেখভালের জন্য লোক ভাড়া করি। ফলে আমাদের বন্ধুত্ব এখন বিনোদন ও আনন্দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যেখানে ট্রিপ বা পার্টিগুলোই মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। মানুষ এখন জন্মদিনের মতো বড় আয়োজনের মাধ্যমে জীবনের বিভিন্ন স্তরের মানুষদের—যেমন স্কুলের বন্ধু, সহকর্মী ও আত্মীয়দের—এক জায়গায় এনে নিজের জীবনের সব ভূমিকাকে একসাথে উদযাপন করতে চায়।
৪০ বছরে পা দিতে যাওয়া কেজলের কাছেও বিষয়টি এমনই। তিনি তার জন্মদিনকে কেবল মদ্যপান বা হ্যাংওভারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গভীর সংযোগ ও সুন্দর স্মৃতির উইকএন্ড হিসেবে কাটাতে চান। তিনি বলেন, ‘এটি আমার গত ৪০ বছরের অর্জনকে উদযাপন করার এবং যারা আমাকে সবসময় সমর্থন করেছেন তাদের ধন্যবাদ জানানোর একটি উপায়।’ জন্মদিনের এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের পেছনে যে মানসিকতাই থাকুক না কেন, দিনশেষে অধিকাংশ মানুষই প্রিয়জনদের সাথে অর্থপূর্ণ কিছু সময় কাটাতে চান। আর এই ব্যস্ততার যুগে সবাইকে এক ছাদের নিচে আনার জন্য হয়তো তাদের একটি চমৎকার সময়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়াই একমাত্র পথ।

