ব্রিটেনের দাস ব্যবসার অন্ধকার ইতিহাস: তালিকায় ১০,৫০০ বিনিয়োগকারীর নাম

ব্রিটেনের দাস ব্যবসার অন্ধকার ইতিহাস এবং এর সাথে দেশটির রাজপরিবার, সংসদ ও অভিজাত শ্রেণির গভীর সম্পৃক্ততার চিত্র উন্মোচন করেছে নতুন এক ঐতিহাসিক গবেষণা। 'দ্য রেজিস্টার অব ব্রিটিশ স্লেভ ট্রেডার্স' (The Register of British Slave Traders) নামের তিন বছর মেয়াদী এই গবেষণা প্রকল্পে ১৫৬০-এর দশক থেকে শুরু করে ১৮০৭ সালে দাস প্রথা বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত প্রায় ২৫০ বছরের ট্রান্সআটলান্টিক দাস ব্যবসার ১০,৫০০ জন বিনিয়োগকারীর বিস্তারিত তথ্য নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এই গবেষণার মাধ্যমে ব্রিটেনের দাস ব্যবসার এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে এসেছে, যা প্রমাণ করে কীভাবে এই অমানবিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দেশটির বর্তমানের নামী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক উইলিয়াম পেটিগ্রুর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রিটেনের রাজপরিবার এবং সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ সমর্থনে ৩০ লাখেরও বেশি আফ্রিকান পুরুষ, নারী ও শিশুকে বলপূর্বক আমেরিকার বিভিন্ন উপনিবেশ ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বাগানে দাস হিসেবে পাচার করা হয়েছিল। এই গবেষণার প্রধান প্রধান তথ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:

ব্রিটেনের বেশ কয়েকজন রাজা ও রানি সরাসরি এই দাস ব্যবসায় নেতৃত্ব ও বিনিয়োগ করেছিলেন।১০০ জনেরও বেশি ব্রিটিশ সংসদ সদস্য (এমপি) দাস ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করেছিলেন, যারা বর্তমান কনজারভেটিভ এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের পূর্বসূরি টোরি ও হুইগ দলের সদস্য ছিলেন।ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ডজনখানেক পরিচালক এবং আদি অর্থদাতা এই ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলেন।১,০০০ জনেরও বেশি নারী দাস ব্যবসায়ী কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছিলেন।চার্চ অব ইংল্যান্ডের ৪৫ জন যাজক দাস ব্যবসার সাথে জড়িত 'রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানি' (আরএসি)-তে বিনিয়োগ করেছিলেন।এই ঐতিহাসিক রেজিস্টারটি নিয়ে ইতিহাসবিদ ডেভিড ওলুসোগার উপস্থাপনায় বিবিসি একটি দুই পর্বের প্রামাণ্যচিত্র সম্প্রচার করছে। এই তালিকা প্রকাশের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর দাস প্রথার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বৈশ্বিক দাবি আরও জোরালো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাজ্যের বর্তমান ও পূর্ববর্তী সরকারগুলো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাদের যুক্তি, তৎকালীন সময়ে দাস ব্যবসা কোনো বেআইনি কাজ ছিল না। এই অবস্থানের আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত সপ্তাহে জ্যামাইকার একটি সরকারি প্রতিনিধি দল রাজা চার্লসের কাছে একটি পিটিশন জমা দিয়েছে, যাতে প্রিভি কাউন্সিলের মাধ্যমে একটি আইনি রুলিং চাওয়া হয়েছে।

ঐতিহাসিক নথিপত্রে দাসদের চেয়ে তাদের মালিকদের তথ্য অনেক বেশি সংরক্ষিত রয়েছে। দাসদের আইনগতভাবে কেবল সম্পদ বা পণ্য হিসেবে গণ্য করা হতো, ফলে লাখ লাখ দাসের কোনো স্থায়ী পরিচয় নথিবদ্ধ করা হয়নি। তবে দাস ব্যবসায়ীদের জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, উইল এবং কোম্পানির নথিপত্র অত্যন্ত যত্ন সহকারে রাখা হয়েছিল, যার ওপর ভিত্তি করেই এই রেজিস্টার তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকায় ব্রিটেনের অনেক সুপরিচিত ব্যক্তিত্বের নাম রয়েছে, যাদের ইতিবাচক অবদানের জন্য আজ ট্রাফালগার স্কয়ারে ভাস্কর্য রয়েছে বা ইতিহাসে সম্মানিত করা হয়। যেমন, রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানির (আরএসি) অন্যতম প্রধান অংশীদার ছিলেন রাজা দ্বিতীয় জেমস, বিখ্যাত সুরকার জর্জ ফ্রেডেরিক হ্যান্ডেল এবং দার্শনিক জন লক। এছাড়া সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালের স্থপতি স্যার ক্রিস্টোফার রেন ১৬৮২ সালে রয়্যাল সোসাইটির একটি সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন, যেখানে আরএসি-তে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

তালিকায় থাকা অন্যতম আলোচিত দাস ব্যবসায়ী হলেন এডওয়ার্ড কলস্টন। তিনি ছিলেন আরএসি-র একজন পরিচালক, টোরি এমপি এবং ব্রিস্টলের বহু স্কুল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক। ২০২০ সালে 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলনের সময় ব্রিস্টলে তার একটি ভাস্কর্য বিক্ষোভকারীরা উপড়ে ফেলেছিল। ১৬৬০ সালে রাজতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠার পর ব্রিটিশ রাজপরিবার দাস ব্যবসায় নেতৃত্ব দিতে শুরু করে এবং ১৬৭২ সালে রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে। রাজা দ্বিতীয় জেমস ও তার কাজিন প্রিন্স রুপার্টের নেতৃত্বে এই কোম্পানি রাজকীয় নৌবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে দাস ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। এই কোম্পানি অন্তত ১,৫০,০০০ আফ্রিকান মানুষকে আটলান্টিক পাড়ি দিতে বাধ্য করেছিল, যা ইউরোপীয় দাস প্রথার ইতিহাসে কোনো একক কোম্পানির পক্ষে সর্বোচ্চ।

পরবর্তীতে ১৭১২ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট দাস ব্যবসার ওপর থেকে রাজকীয় একচেটিয়া অধিকার তুলে নিয়ে একে উন্মুক্ত করে দেয়, যা 'মুক্ত বাণিজ্য' হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। এই সময়ে ল্যাঙ্কাস্টার থেকে নির্বাচিত টোরি এমপি রবার্ট হেইশাম রাজকীয় একচেটিয়া আধিপত্যের বিরোধিতা করে নিজে স্বাধীনভাবে বড় আকারের দাস ব্যবসা শুরু করেন। হেইশাম এবং বার্বাডোসে বসবাসকারী তার ভাই উইলিয়াম হেইশাম প্রায় ৯,০০০ আফ্রিকান মানুষকে পাচার করেছিলেন, যার মধ্যে ১,৩৫০ জন জাহাজের অমানবিক পরিবেশের কারণে পথেই মারা যান।

ইতিহাসবিদরা এই গবেষণায় 'স্লেভ ভয়েজেস' ডাটাবেজ এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের 'লেগাসিস অব ব্রিটিশ স্লেভারি' আর্কাইভের সাহায্য নিয়েছেন। ১৮৩৩ সালে দাস প্রথা বিলুপ্তির পর ব্রিটিশ সরকার দাস মালিকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২০ মিলিয়ন পাউন্ড (যা আজকের হিসাবে প্রায় ২.৭ বিলিয়ন পাউন্ডের সমান) দিয়েছিল, কিন্তু মুক্ত হওয়া দাসদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। এই বৈষম্য আজও এক বড় ঐতিহাসিক অবিচার হিসেবে বিবেচিত হয়।

দাস ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ কেবল লন্ডনের অভিজাতদের কাছেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ব্রিস্টল ও লিভারপুলের মতো বন্দর শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্রিস্টলের রিচার্ড ফার ৩৮টি জাহাজের মাধ্যমে ১০,০০০-এর বেশি মানুষ এবং জেমস ল্যারোশ ৪২ বছর ধরে ১০৫টি জাহাজের মাধ্যমে ৩০,০০০-এর বেশি মানুষকে দাস হিসেবে পাচার করেন। ১৭৫০ সালের পর লিভারপুল এই ব্যবসার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এডমন্ড স্মিথ জানিয়েছেন, লিভারপুলের ৫১ জন মেয়র সরাসরি দাস ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম আর্থার হেউড ৮০টি যাত্রায় ২১,৬৪৮ জন মানুষকে পাচার করেন এবং পরে 'আর্থার হেউড অ্যান্ড সনস' ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে বার্কলেস ব্যাংকের সাথে যুক্ত হয়। এছাড়া ব্রায়ান ব্লান্ডেল এবং উইলিয়াম আর্ল (যিনি ১১৭টি যাত্রায় ৩৬,৫৬৫ জন মানুষ পাচার করেছিলেন) লিভারপুলের দাস ব্যবসার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

১৭৫০ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এক আইন পাসের মাধ্যমে দাস ব্যবসাকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, "আফ্রিকার সাথে এই বাণিজ্য গ্রেট ব্রিটেনের জন্য অত্যন্ত লাভজনক এবং উপনিবেশগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয়।" এই ব্যবসার সাথে ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবেরও গভীর সংযোগ ছিল। বার্মিংহামের তৈরি বন্দুক আফ্রিকায় রপ্তানি করে তার বিনিময়ে দাস কেনা হতো।

২০২৬ সালের মার্চ মাসে জাতিসংঘের একটি ঘোষণাপত্রে আফ্রিকানদের দাসত্ব ও পাচারকে "মানবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ" হিসেবে অভিহিত করা হয়। ঘানার প্রেসিডেন্ট জন দ্রামানি মাহামার নেতৃত্বে আনা এই প্রস্তাবের পক্ষে অধিকাংশ দেশ ভোট দিলেও ব্রিটেন ভোটদানে বিরত থাকে। ব্রিটিশ সরকারের দাবি, এই প্রস্তাবটি ঐতিহাসিক অপরাধগুলোর মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি করছে এবং তৎকালীন আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দাস প্রথা কোনো অপরাধ ছিল না।

শিরোনাম :
ইরানি কাপ: মুকেশের পাঁচ উইকেট সত্ত্বেও এগিয়ে জম্মু ও কাশ্মীর ইসরায়েলগামী বিমানে হামলার ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত ট্রাম্পের হুথিদের সহায়তার অভিযোগে মার্কিন জ্বালানি দপ্তরের প্রকৌশলী গ্রেপ্তার সঠিক পরিকল্পনা ও সৎ নেতৃত্ব থাকলে ঢাকাকে বদলে দেওয়া সম্ভব সার্বিয়ার ক্যাফেতে আলপাকার সঙ্গে কফি পানের ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা স্ট্রিট স্টাইলে নজর কাড়লেন অ্যালেক্স রদ্রিগেজের প্রেমিকা মেগান হেইডেন ইরানি কাপ: শ্রীনগরে জম্মু ও কাশ্মীরের পেসারদের দাপট সামরিক কর্মকর্তাদের সংখ্যা ২০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা পিট হেগসেথের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গণধর্ষণের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ এআই জার হিসেবে জে ক্লেটনকে বেছে নিতে পারেন ট্রাম্প ইরানি কাপ: মুকেশের পাঁচ উইকেট সত্ত্বেও এগিয়ে জম্মু ও কাশ্মীর ইসরায়েলগামী বিমানে হামলার ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত ট্রাম্পের হুথিদের সহায়তার অভিযোগে মার্কিন জ্বালানি দপ্তরের প্রকৌশলী গ্রেপ্তার সঠিক পরিকল্পনা ও সৎ নেতৃত্ব থাকলে ঢাকাকে বদলে দেওয়া সম্ভব সার্বিয়ার ক্যাফেতে আলপাকার সঙ্গে কফি পানের ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা স্ট্রিট স্টাইলে নজর কাড়লেন অ্যালেক্স রদ্রিগেজের প্রেমিকা মেগান হেইডেন ইরানি কাপ: শ্রীনগরে জম্মু ও কাশ্মীরের পেসারদের দাপট সামরিক কর্মকর্তাদের সংখ্যা ২০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা পিট হেগসেথের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গণধর্ষণের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ এআই জার হিসেবে জে ক্লেটনকে বেছে নিতে পারেন ট্রাম্প