ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেয়েন কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রথম 'সহযোগী সদস্য' হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছেন। বুধবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, কানাডার জন্য ইইউ-এর দরজা খুলে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি কাজ করতে আগ্রহী, যা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার করবে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত সপ্তাহে ইইউ-এর সঙ্গে একটি 'অনন্য জোট' গড়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। বর্তমানে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনাকর সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা মূলত বাণিজ্য সংক্রান্ত বিরোধের কারণে আরও জটিল হয়েছে। ভন ডের লেয়েন তার ভাষণে উল্লেখ করেন যে, ইউরোপের জন্য কৌশলগত অংশীদারিত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ পছন্দ এবং এটি আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থায় সৃষ্ট ফাটল পূরণে ভূমিকা রাখে।
স্ট্রাসবার্গে আয়োজিত বার্ষিক মূল বক্তব্যে মার্ক কার্নি উপস্থিত ছিলেন এবং বৃহস্পতিবার তার পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। গত মাসে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ট্রাম্পের কানাডাকে '৫১তম অঙ্গরাজ্য' বানানোর মন্তব্যের কারণেও দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বিরোধ বেড়েছে।
ভন ডের লেয়েন তার ভাষণে আরও বলেন, ইইউ এবং কানাডা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূ-রাজনীতির মতো বিষয়ে একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তিনি বলেন, ইউক্রেন, প্রতিরক্ষা, কাঁচামাল এবং সরবরাহ চেইনের মতো বিষয়ে তারা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক শুল্ক নীতি এবং ইইউ সদস্য ডেনমার্কের সার্বভৌম অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির মুখেও দুই পক্ষ ঐক্যবদ্ধ থেকেছে।
এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ ইউক্রেনকে এই নতুন মর্যাদা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এছাড়া পূর্ব ইউরোপের দেশ জর্জিয়া এবং মলদোভাও একই ধরনের আবেদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ভন ডের লেয়েন জানান, কানাডার সঙ্গে ইইউ-এর সম্পর্ককে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
আগামী বছরের রাজনৈতিক ও নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণের সময় ভন ডের লেয়েন একটি 'ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিষদ' গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছেন। এতে যুক্তরাজ্য এবং ইউক্রেনকেও অন্তর্ভুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে। তিনি বলেন, রাশিয়ার পক্ষ থেকে মহাদেশের জন্য চলমান হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে এটি আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকেই এমন একটি সংস্থার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা পরিষদের ধারণাটি মূলত ফ্রান্স ও জার্মানির প্রস্তাব ছিল। তবে ট্রাম্পের ন্যাটোর সামরিক জোট নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর থেকে আরও অনেক দেশ এতে সমর্থন জানিয়েছে। যদিও কিছু দেশ আশঙ্কা করছে যে, এই পরিষদ ন্যাটোর প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারে। ভন ডের লেয়েন স্পষ্ট করেন যে, ইইউ ন্যাটোর সঙ্গে কাজ জোরদার করছে এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় ন্যাটোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হবে।
নিরাপত্তা পরিষদের মূল লক্ষ্য হবে কোনো সদস্য দেশ হুমকির মুখে পড়লে জরুরি বৈঠক ডাকা, যা ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৪-এর অনুরূপ। ভন ডের লেয়েন একে ন্যাটোর কার্যক্রমে বাড়তি সমর্থন হিসেবে উল্লেখ করেন। এছাড়া তিনি ইউরোপীয় পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে এআই ল্যাবগুলোর সঙ্গে আলোচনা, ব্যবসার আমলাতন্ত্র কমানো এবং শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপের পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে। এর আওতায় ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করা এবং ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের জন্য কঠোর নিয়মাবলি প্রবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

