‘ট্রাম্পের মুখোমুখি না হওয়াটা ছিল সহজ এক ‘না’’: বর্ণবাদ ও প্রতিবাদ নিয়ে কলিন কেপারনিক

আমেরিকান ফুটবলের শীর্ষ স্তরে প্রায় ১০ বছর খেলেননি কলিন কেপারনিক। কিন্তু এখনো প্রতিদিন ভোর সাড়ে ৪টায় ঘুম থেকে উঠে কঠোর অনুশীলন করেন তিনি। গতি, শক্তি ও পজিশন ভিত্তিক ট্রেইনিং—সবকিছুই আগের মতোই সচল রেখেছেন ৩৮ বছর বয়সী এই সাবেক সান ফ্রান্সিসকো ফোর্টি নাইনআর্স (49ers) কোয়ার্টারব্যাক। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা এই অ্যাথলেট ভালো করেই জানেন যে, মাঠে ফেরার সুযোগ দিন দিন কমে আসছে, তবুও তিনি নিজেকে প্রস্তুত রাখছেন। সম্প্রতি এক বিরল সাক্ষাৎকারে তিনি তার জীবনের নানা চড়াই-উতরাই, নতুন স্মৃতিকথা ‘দ্য পেরিলাস ফাইট’ (The Perilous Fight) এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পেছনের গল্প নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।

২০১৬ সালের আগস্টে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কেপারনিকের সেই ঐতিহাসিক প্রতিবাদের সূত্রপাত হয়েছিল। শুরুতে বিষয়টি ছিল একেবারেই ব্যক্তিগত। কেপারনিক জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর হওয়া দশকের পর দশক ধরে চলা নিপীড়নের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এমনকি তার তৎকালীন বাগদত্তা (বর্তমানে স্ত্রী) নেসা দিয়াবকেও তিনি কিছু জানাননি। সান্তা ক্লারায় একটি প্রাক-মৌসুম ম্যাচে জাতীয় সংগীতের সময় তিনি প্রথম তিনবার কেবল একটি কুল বক্সের ওপর বসেছিলেন। চোট থেকে সেরে ওঠার কারণে তিনি খেলার পোশাকে ছিলেন না, তাই শুরুতে কেউ লক্ষ্য করেনি। তৃতীয়বারের মাথায় কৃষ্ণাঙ্গ সাংবাদিক স্টিভ ওয়াইচ বিষয়টি খেয়াল করেন এবং কেপারনিকের সঙ্গে কথা বলেন। এর আগে থেকেই কেপারনিক তার সোশ্যাল মিডিয়ায় ম্যালকম এক্স, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, মোহাম্মদ আলী এবং ব্ল্যাক প্যান্থারের প্রতিষ্ঠাতা হিউ পি নিউটনের উক্তি শেয়ার করছিলেন।

কেপারনিকের এই প্রতিবাদের পেছনে কাজ করেছিল বেশ কয়েকটি পুলিশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সান ফ্রান্সিসকোতে পুলিশি নির্যাতনে মারিও উডস নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের মৃত্যু হয়। এরপর ২০১৬ সালের জুলাইয়ে লুইজিয়ানায় অল্টন স্টার্লিং এবং মিনেসোটায় ফিল্যান্ডো ক্যাসটাইলকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। কেপারনিক বলেন, “আপনি যখন সমস্যা ও বাস্তবতাকে বুঝতে পারবেন, তখন আয়নায় নিজের মুখোমুখি হয়ে হয় আপনাকে পদক্ষেপ নিতে হবে, নয়তো এই অন্যায়ের সহযোগী হতে হবে।” সতীর্থ এরিক রিডের পরামর্শে পরবর্তীতে তিনি জাতীয় সংগীতের সময় হাঁটু গেড়ে (taking the knee) বসা শুরু করেন, যা বিশ্বজুড়ে এক শক্তিশালী প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।

এই প্রতিবাদের পর কেপারনিকের ওপর নেমে আসে তীব্র সমালোচনা ও হুমকি। গ্যালারি থেকে ভেসে আসত দুয়ো এবং ‘ইউএসএ! ইউএসএ!’ স্লোগান। স্টেডিয়ামের বাইরে তার ছবিকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে টি-শার্ট বিক্রি শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ণবাদী আক্রমণের পাশাপাশি তার বাড়িতে আসতে থাকে মৃত্যুর হুমকি। নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে ও তার স্ত্রীকে সাময়িকভাবে নিজেদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, “হয়তো তার এমন কোনো দেশ খুঁজে নেওয়া উচিত যা তার জন্য ভালো কাজ করবে।” অন্যদিকে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য স্টিভ কিং কেপারনিকের স্ত্রী নেসা দিয়াবের মিশরীয় বংশোদ্ভূত পরিচয় টেনে এনে এটিকে ‘আইএসের প্রতি সহানুভূতিশীল সক্রিয়তা’ বলে আখ্যা দেন। তবে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন, কেপারনিক একটি বৈধ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলছেন।

২০১৬ মৌসুমের শেষে ফোর্টি নাইনআর্সের নতুন কোচ ও ম্যানেজার কেপারনিককে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেন, অন্যথায় পরে তাকে দল থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। কেপারনিক এটিকে তাদের ‘কাপুরুষোচিত’ আচরণ বলে বর্ণনা করেন। ২০১৭ সালের পর কোনো দলই তাকে আর দলে নেয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, সমাজকে উন্নত করার এবং মানুষের জীবন বাঁচানোর লড়াই করার অপরাধে এনএফএল (NFL) তাকে একঘরে বা ব্ল্যাকলিস্টেড (blackballed) করেছে। ২০১৭ সালের অক্টোবরে তিনি এনএফএলের বিরুদ্ধে যোগসাজশের (collusion) মামলা করেন, যা ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতের বাইরে একটি অপ্রকাশিত চুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। এনএফএল কমিশনার রজার গুডেল অবশ্য তাকে ব্ল্যাকলিস্ট করার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

সাক্ষাৎকারে কেপারনিক প্রকাশ করেন যে, ২০১৭ বা ২০১৮ সালের দিকে ট্রাম্পের আইনজীবীরা তার সঙ্গে একটি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করার সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে কেপারনিক হাসিমুখে বলেন, “সেটি ছিল অত্যন্ত সহজ একটি ‘না’। যাঁর সমাজকে আরও সুন্দর ও সমতাভিত্তিক করতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী, আমি কেবল তাঁদের সঙ্গেই কাজ করতে রাজি। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তেমনটি ছিল না। এটি কেবলই একটি ফটো তোলার সুযোগ খোঁজার চেষ্টা ছিল।”

কেপারনিকের এই প্রতিবাদ পরবর্তীতে ২০২০ সালে জর্জ ফ্লয়েডের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফুটবল, বাস্কেটবল থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের ফুটবল দলও ম্যাচের আগে হাঁটু গেড়ে বসে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংহতি জানাতে শুরু করে। তবে কেপারনিক মনে করেন, অনেক প্রতিষ্ঠানই এই আবেগকে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। তিনি বর্তমানে তার ‘নো ইয়োর রাইটস ক্যাম্প’ (Know Your Rights Camp) সংস্থার মাধ্যমে তরুণদের অধিকার সচেতন করার কাজ করছেন। তার দাতব্য সংস্থাটি কৃষ্ণাঙ্গদের আইনি সহায়তা ও স্বাধীন ময়নাতদন্তের খরচ জোগায়। যেমনটি তারা করেছে গত জুলাইয়ে রহস্যজনকভাবে মারা যাওয়া মিসিসিপির কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর নোলান ওয়েলসের পরিবারের জন্য। চার বছর বয়সী এক কন্যাসন্তানের বাবা কেপারনিক বলেন, বাবা হওয়ার পর তার এই লড়াইয়ের তাগিদ আরও বেড়ে গেছে।

নিজের পারিবারিক জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কেপারনিক জানান, তিনি এক কৃষ্ণাঙ্গ বাবা ও শ্বেতাঙ্গ মায়ের ঘরে জন্ম নেন। মাত্র পাঁচ সপ্তাহ বয়সে তাকে উইসকনসিনের এক শ্বেতাঙ্গ রক্ষণশীল পরিবার দত্তক নেয়। শ্বেতাঙ্গ প্রধান এলাকায় বড় হওয়ার কারণে তাকে নানা বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। আট বছর বয়সে প্রতিবেশীর শ্বেতাঙ্গ ছেলেরা তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে বর্ণবাদী গালি দিয়েছিল এবং ‘নাইজারে ফিরে যাও’ বলেছিল। এমনকি কৈশোরে বাস্কেটবল তারকা অ্যালান আইভারসনের মতো চুলে বেণি করায় নিজের দত্তক নেওয়া বাবা-মাও তাকে ‘অপরাধী’ (thug) বলে মন্তব্য করেছিলেন। তারা কৃষ্ণাঙ্গ বান্ধবীর চেয়ে শ্বেতাঙ্গ বান্ধবীকে বেশি পছন্দ করতেন। তবে তিনি জানেন যে তার বাবা-মা তাকে ভালোবাসতেন। কৈশোরে গাড়ি চালানোর সময় কেবল কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে তাকে পুলিশ থামিয়েছিল এবং কলেজে পড়ার সময় তার কৃষ্ণাঙ্গ রুমমেটদের দিকে পুলিশ বন্দুক তাক করেছিল।

২০১১ সালে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করা কেপারনিক ২০১২ সালে ফোর্টি নাইনআর্সকে সুপার বোলে নিয়ে গিয়েছিলেন, যদিও তারা বাল্টিমোর রেভেনসের কাছে হেরে যান। এনএফএলের স্কাউটিং কম্বাইনকে তিনি তার বইয়ে ক্রীতদাস বাজারের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে খেলোয়াড়দের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইতিহাসের অন্যান্য কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাথলেটদের মতো কেপারনিকও নিজের ক্যারিয়ারের বিনিময়ে প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছেন। মোহাম্মদ আলী, টমি স্মিথ, জন কার্লোস, কার্ট ফ্লাড বা মাহমুদ আব্দুল-রউফের মতো খেলোয়াড়রাও একইভাবে নিজেদের ক্যারিয়ার উৎসর্গ করেছিলেন। ২০২২ সালে লাস ভেগাস রেইডার্সের সঙ্গে একটি ট্রায়াল দিলেও কেপারনিকের আর এনএফএলে ফেরা হয়নি। তবে তিনি এখনো মাঠে ফিরতে প্রস্তুত এবং সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আবারও সুযোগ পেলে তিনি জাতীয় সংগীতের সময় হাঁটু গেড়েই প্রতিবাদ জানাবেন। কারণ, “কাজটি এখনো শেষ হয়নি এবং মানুষের জীবন এখনো ঝুঁকির মুখে।”

শিরোনাম :
স্ট্রিট স্টাইলে নজর কাড়লেন অ্যালেক্স রদ্রিগেজের প্রেমিকা মেগান হেইডেন ইরানি কাপ: শ্রীনগরে জম্মু ও কাশ্মীরের পেসারদের দাপট সামরিক কর্মকর্তাদের সংখ্যা ২০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা পিট হেগসেথের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গণধর্ষণের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ এআই জার হিসেবে জে ক্লেটনকে বেছে নিতে পারেন ট্রাম্প আফনানকে জামায়াত থেকে বহিষ্কারের খবরটি গুজব, দাবি স্থানীয় নেতাদের ভারত এ-কে ৩৬৫ রানের লক্ষ্য দিল অস্ট্রেলিয়া এ তরুণ দর্শকদের টানতে ফুটবল ম্যাচের বিরতি বাতিলের ভাবনা দে লরেন্তিসের টেলিগ্রামে ঝিনাইদহ আ.লীগের কমিটি ঘোষণা করলেন হাসিনা, গোয়েন্দারা অন্ধকারে কালিনিনগ্রাদ রক্ষায় রাশিয়ার সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি স্ট্রিট স্টাইলে নজর কাড়লেন অ্যালেক্স রদ্রিগেজের প্রেমিকা মেগান হেইডেন ইরানি কাপ: শ্রীনগরে জম্মু ও কাশ্মীরের পেসারদের দাপট সামরিক কর্মকর্তাদের সংখ্যা ২০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা পিট হেগসেথের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গণধর্ষণের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ এআই জার হিসেবে জে ক্লেটনকে বেছে নিতে পারেন ট্রাম্প আফনানকে জামায়াত থেকে বহিষ্কারের খবরটি গুজব, দাবি স্থানীয় নেতাদের ভারত এ-কে ৩৬৫ রানের লক্ষ্য দিল অস্ট্রেলিয়া এ তরুণ দর্শকদের টানতে ফুটবল ম্যাচের বিরতি বাতিলের ভাবনা দে লরেন্তিসের টেলিগ্রামে ঝিনাইদহ আ.লীগের কমিটি ঘোষণা করলেন হাসিনা, গোয়েন্দারা অন্ধকারে কালিনিনগ্রাদ রক্ষায় রাশিয়ার সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি