ইউরোপের দীর্ঘতম নদী দানিউবের তলদেশ থেকে শতাব্দীর প্রাচীন এক সতর্কবার্তা হিসেবে পরিচিত ‘ক্ষুধার পাথর’ (Ínség-szikla) জেগে উঠেছে। হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের গেলার্ট পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পাথরটি যখনই পানির স্তর কমে দৃশ্যমান হতো, তা দুর্ভিক্ষ ও ফসলের ক্ষতির পূর্বাভাস দিত। বর্তমান রেকর্ড পরিমাণ পানি হ্রাসের ফলে পাথরটি কেবল দৃশ্যমানই হয়নি, বরং এর চারপাশের বালুকাময় নদীর তলদেশও পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে, যা সরকারি বিজ্ঞানী ও ভূতাত্ত্বিকদের বিস্মিত করেছে।
তীব্র খরার কারণে হাঙ্গেরি এক নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। এর ফলে গত ৪৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দানিউবের পানিতে শীতল হওয়া পারমাণবিক চুল্লিগুলোর প্রায় সবগুলো বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে দেশটি। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী পিটার ম্যাগয়ার সতর্ক করেছেন যে, এবারের খরার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি ২০২২ সালের ঐতিহাসিক খরাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দানিউব নদের তীরবর্তী পেস্ট কাউন্টির পকসম্যাগিয়ার গ্রামের ৫৬ বছর বয়সী কৃষক ইস্তভান সোমোগি জানান, চলতি বছর তার ফসলের প্রায় ৫০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে এবং তা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তিনি বলেন, কমিউনিস্ট শাসনের পর থেকে এমন বিপর্যয় তিনি আর দেখেননি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র ও ঘন ঘন হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দানিউবের কৃষি ও পানি সরবরাহের ওপর।
বুদাপেস্টের তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোয় নদীর বিভিন্ন অংশে পানির গভীরতা গোড়ালি পর্যন্ত নেমে এসেছে। দানিউবের এই করুণ দশার সুযোগ নিয়ে অনেকে নদীর শুকিয়ে যাওয়া তলদেশে হাঁটাহাঁটি করছেন। তবে নদী উদ্ধারকারী দলের প্রধান লাজলো বালাজ জানান, গভীর গর্তে পড়ে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় সাঁতার ও নৌচলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জুনের শেষদিকে বুদাপেস্ট পুলিশ নদীতে তিনজনের নিখোঁজ হওয়ার কথা জানিয়েছিল, যাদের মধ্যে একজনের মরদেহ ইভানসার কাছে উদ্ধার করা হয়েছে।
খরা ও জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি অনেক শহরে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জেনটেনড্রে শহরের ডেপুটি মেয়র জোসেফ গুলিয়াস জানান, প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার পরিবার পানি সংকটে পড়েছে এবং প্রতিদিন প্রায় ১০০টি জরুরি কলের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করতে হচ্ছে। বুদাপেস্টের কাছে দানিউবের পানির স্তর ৪ আগস্ট মাত্র ১৪-১৯ সেন্টিমিটারে নেমে আসে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম।
পানি কমে যাওয়ায় নদীর তলদেশে লুকানো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ধ্বংসপ্রাপ্ত সেতু, নাৎসি যুদ্ধজাহাজ এবং ব্রিটিশ বোমার মতো অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন বেরিয়ে এসেছে। এমনকি হাঙ্গেরির সাইক্লিস্ট ক্লাবের সভাপতি গ্যাবর কুর্তি তার সাইকেল নিয়ে নদীর তলদেশ দিয়ে ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি কেবল একটি অ্যাডভেঞ্চার নয়, বরং জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতার এক করুণ বহিঃপ্রকাশ।
পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকাতেও খরার প্রভাব প্রকট। পার্ক ও গাছপালা বাঁচাতে মিউনিসিপ্যাল কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা গেজা ওরসোস রেনাতা জানান, রান্নার পানির জন্য তাদের প্রতিবেশীর ওপর নির্ভর করতে হয়, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। দানিউবের এই ঐতিহাসিক পাথরটি আবারও পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারায় আগামী বছর আরও ভয়াবহ খরার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

