ফেসিয়াল অ্যানালাইসিস বা মুখের গঠন বিশ্লেষণের নামে নারীদের কাছ থেকে শত শত ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। 'লুক্সম্যাক্সিং' (looksmaxxing) নামক এক চরম সৌন্দর্য চর্চার জোয়ারে গা ভাসিয়ে অনেক নারী এসব স্ক্যানের পেছনে ছুটছেন। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথাকথিত বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের মুখের খুঁতগুলো ধরিয়ে দিয়ে কসমেটিক সার্জারি বা বোটক্সের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এসব সেবার পেছনে কোনো বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি নেই এবং এটি ব্যবহারকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।
৩৭ বছর বয়সী ড্যানিয়েল একসময় মডেলিং করতেন এবং পুরুষদের কাছ থেকে বেশ ইতিবাচক মনোযোগ পেতেন। কিন্তু দুই বছরের বেকারত্ব ও আর্থিক অনটনের কারণে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে। তিনি ভাবতেন, তার চেহারা যদি আরও সুন্দর হতো, তবে হয়তো জীবনটা সহজ হতো। এই অবস্থায় টিকটকে বিজ্ঞানভিত্তিক 'ফেসিয়াল অ্যানালাইসিস' সেবার বিজ্ঞাপন দেখে তিনি ৩৩০ ডলার খরচ করে 'কোভস' (Qoves) নামক একটি প্রতিষ্ঠানে নিজের সেলফি পাঠান। বিনিময়ে তিনি ৩০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন পান।
কোভসের সেই প্রতিবেদনে ড্যানিয়েলের কানের আকৃতি থেকে শুরু করে নারীসুলভ বৈশিষ্ট্যগুলোর রেটিং দেওয়া হয়। তাকে রাইনোপ্লাস্টি (নাকের সার্জারি), লোয়ার ব্লেফারোপ্লাস্টি (চোখের পাতার সার্জারি), ক্যানথোপেক্সি, থুতনির ইমপ্লান্ট এবং ম্যালারপ্লাস্টি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া মাইক্রোব্লেডিং, ল্যাশ এনহান্সমেন্ট, কপালে ও গালে ফিলার এবং মুখের চারপাশে বোটক্স ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়। বর্তমানে কলোরাডোর প্রযুক্তি খাতে কর্মরত ড্যানিয়েল ক্রেডিট কার্ডের ঋণ পরিশোধের পর এই কসমেটিক সার্জারির জন্য মেক্সিকোতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
কোভস দাবি করে থাকে যে, সুন্দর মানুষেরা হাসপাতাল থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত সব জায়গায় ভালো আচরণ পান এবং তাদের চাকরি পাওয়া ও বেশি আয় করা সহজ হয়। মনোবিজ্ঞানে 'হ্যালো ইফেক্ট' (halo effect) নামে একটি প্রমাণিত ধারণা রয়েছে, যেখানে সুন্দর মানুষকে বেশি বুদ্ধিমান ও সামাজিক মনে করা হয় এবং গবেষণায় আকর্ষণীয়তার সাথে ভালো বেতনের সংযোগও দেখা গেছে। এই বৈষয়িক সুবিধার আশায় অনেকেই 'লুক্সম্যাক্সিং' সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকছেন। এই সংস্কৃতির অনুসারীরা মনে করেন সৌন্দর্যকে পরিমাপ করা সম্ভব এবং নাকের সাথে চোখ বা অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের আদর্শ অনুপাত বা 'ফেসিয়াল হারমোনি' অর্জন করাই তাদের লক্ষ্য।
২৫ বছর বয়সী ওশেন ইউটিউবে কোভসের ভিডিও দেখে এই সেবার খোঁজ পান, যেখানে তাদের ১০ লাখেরও বেশি সাবস্ক্রাইবার রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই নিজের চেহারা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগা ওশেনকে স্কুলে সহপাঠীরা তার নাকের কারণে 'ডলফিন' বলে খ্যাপাতো। তিনি ৮০ ডলার অতিরিক্ত খরচ করে দ্রুত সেবার মাধ্যমে কোভসের কাছ থেকে রিপোর্ট সংগ্রহ করেন। রিপোর্টে তার নাকে কোনো পরিবর্তনের পরামর্শ না দেওয়ায় তিনি স্বস্তি পেলেও তার অন্যান্য খুঁতগুলো সেখানে নিশ্চিত করা হয়।
কোভস তাদের প্রচারণায় অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. ট্রেসি ভ্যালেনকোর্টের গবেষণা ব্যবহার করে থাকে। তবে ড. ভ্যালেনকোর্ট এই সেবার চরম সমালোচনা করে বলেছেন, "এটি নারীদের আত্মবিশ্বাসের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সৌন্দর্যকে পরিমাপের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে কোনো সেবা কি কখনো কাউকে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক শান্তি দিতে পারে, নাকি এটি কেবল আত্ম-সমালোচনার চক্রকে দীর্ঘায়িত করে?" তিনি জানান, কোভস তার গবেষণার ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছে। তিনি সৌন্দর্যের গবেষক নন, বরং বুলিং বা হয়রানি এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন। তার মতে, বডি ডিসমরফিয়া (নিজের অবয়ব নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা), খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা বা কম আত্মসম্মানবোধে ভোগা ব্যক্তিদের জন্য এই ধরনের স্ক্যান অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। ১৮ বছরের বয়সসীমা থাকলেও অপ্রাপ্তবয়স্করা সহজেই এটি এড়িয়ে যেতে পারে।
সাউথ ক্যারোলিনা সালকেহ্যাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. জাস্টিন মগিলস্কি ২০১৮ সালে 'ফ্রন্টিয়ার্স অফ সাইকোলজি' জার্নালে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন, যা কোভস তাদের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করে। ড. মগিলস্কি বলেন, তার গবেষণাটি ছিল সীমিত সংখ্যক মার্কিন কলেজ শিক্ষার্থীদের ওপর এবং এর ফলাফল বিশ্বব্যাপী বা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়। আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ড. মিচ ব্রাউন বলেন, আকর্ষণীয়তার বিজ্ঞান অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং এই ধরনের সেবার পেছনে কোনো স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
এই সেবাগুলোর বিরুদ্ধে ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গদের সৌন্দর্যের মানদণ্ড চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যেমন, কোভসের একটি বাংলাদেশি নারীদের মুখের বিশ্লেষণধর্মী ভিডিওতে একজন মন্তব্য করেছেন, "এখানে যা দেখানো হয়েছে তা বাংলাদেশি নারীদের প্রকৃত বৈচিত্র্যের বদলে একটি নির্দিষ্ট সৌন্দর্যের আদর্শকে তুলে ধরে।" এদিকে 'এপিকা' (Epica) নামক আরেকটি ফেসিয়াল অ্যানালাইসিস সেবা তাদের অ্যালগরিদম ও পদ্ধতি প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদক নিজেও এই সেবাগুলোর সত্যতা যাচাই করতে কোভস এবং এপিকাতে নিজের সেলফি আপলোড করেন। কোভস তাকে ১৮টি ট্যাবের বিশ্লেষণ এবং ১৬ পৃষ্ঠার একটি রূপচর্চার নির্দেশিকা পাঠায়, যেখানে তার ঠোঁটে ফিলার ও ভ্রু প্লাক করার কৃত্রিম ছবি যুক্ত ছিল। অন্যদিকে এপিকাতে তার ত্বকের স্বাস্থ্য স্কোর আসে ৬১% এবং কিছু সিরাম কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু ঘরের আলো পরিবর্তন করে সোফায় বসে আবার সেলফি তুলতেই তার স্কোর লাফিয়ে ৮১% এ চলে যায়। ২৬ বছর বয়সী এই প্রতিবেদক বলেন, "লুক্সম্যাক্সিংয়ের এই ভাষাগুলো আমার মাথায় ঢুকে গিয়েছিল এবং আমি আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলাম।"

