যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে খাবার, পানি ও ওষুধ সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন মানবিক কাজগুলো গত প্রায় ৮০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে সুরক্ষিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দুটি যুদ্ধ—ইউক্রেন ও গাজায় এই সুরক্ষা নীতিগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে এবং বারবার উপেক্ষা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ফুড এইড চ্যারিটি সংস্থা ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউসিকে) প্রতিষ্ঠাতা ও মিশেলিন-স্টার জয়ী শেফ হোসে আন্দ্রেস।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণ মাত্রায় আক্রমণ শুরু করার পর থেকে ইউক্রেনে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর ৩,২০০ বারের বেশি হামলা চালিয়েছে রাশিয়া, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় দুবার। এর মধ্যে রয়েছে একই লক্ষ্যবস্তুতে পরপর দুটি হামলা চালানোর মতো অত্যন্ত মারাত্মক "ডাবল-ট্যাপ" কৌশল, যা উদ্ধারকারীদের জন্য বিশেষভাবে প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, গত এপ্রিলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জানানো হয় যে, বিগত তিন বছরে ২১টি দেশে অন্তত ১,০১০ জন মানবিক সহায়তা কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। এই নিহতদের অর্ধেকেরও বেশি মারা গেছেন গাজা এবং পশ্চিম তীরে। এই সংখ্যাটি তার আগের তিন বছরে নিহত ৩৭৭ জন কর্মীর তুলনায় তিন গুণ বেশি। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল টম ফ্লেচার এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেছেন, "এটি দুর্ঘটনাবশত হওয়া কোনো উত্তেজনা নয়, এটি মূলত সুরক্ষার সম্পূর্ণ পতন।"
সুরক্ষার এই পতনের সরাসরি ফল হিসেবেই ২০২৪ সালের এপ্রিলে গাজায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) বিমান হামলায় ডব্লিউসিকেরই সাতজন কর্মী নিহত হন। অথচ সামরিক বাহিনীর সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় রেখেই তারা সেখানে কাজ করছিলেন। সে সময় আইডিএফ এই হামলাকে তাদের নিজস্ব প্রমিত কার্যপ্রণালীর লঙ্ঘন এবং একটি "গুরুতর ভুল" বলে আখ্যায়িত করেছিল। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তখন এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে, তারা আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর মানবিক কার্যক্রমকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সহযোগিতা চালিয়ে যাবে। এই হামলার নির্দেশ দেওয়া রিজার্ভ কর্নেল নোচি মেন্ডেলকে তার দায়িত্ব থেকে বরখাস্তও করা হয়েছিল।
তবে আইডিএফ-এর এই সুন্দর কথাগুলোর অসারতা প্রমাণ হয় যখন গত মাসে তাদের সামরিক প্রসিকিউটর আমাদের কনভয়ে হামলার ঘটনার কোনো ফৌজদারি তদন্ত শুরু না করার সিদ্ধান্ত নেন। উপরন্তু, দ্য গার্ডিয়ানের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ডব্লিউসিকের কনভয়কে লক্ষ্যবস্তু করার পেছনে আইডিএফ-এর একটি সামরিক কৌশল কাজ করেছিল, যাকে বলা হয় "গিল্ট বাই অ্যাসোসিয়েশন" বা সংশ্লিষ্টতার কারণে অপরাধী সাব্যস্ত করার নীতি। এর অর্থ হলো, কেবল সন্দেহ, কোনো ছায়া বা স্রেফ কুসংস্কারের ওপর ভিত্তি করে প্রাণঘাতী হামলা চালানো যেতে পারে। এই অন্যায্য ও বেআইনি কৌশলটি সমস্ত মানবিক সহায়তা কর্মীদের জন্য এক চরম হুমকি।
১৯৪৯ সালে মূলত যুদ্ধের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করা এবং মৌলিক মানবিক চাহিদাগুলো মেটানোর উদ্দেশ্যে চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন তৈরি করা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ বিশ্ববাসীর বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। এই কনভেনশনের অন্যতম প্রধান রূপকার ছিলেন ফরাসি ইহুদি সিভিল সার্ভেন্ট জর্জ কাহেন-সালভাদর। ১৯৪৩ সালে তার পরিবারকে ড্রান্সি ইন্টার্নমেন্ট ক্যাম্পে বন্দি করা হয়েছিল এবং আউশভিটসে নির্বাসনের সময় তারা কোনোমতে সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিলেন। যুদ্ধকালীন এই যৌথ মানবিক মূল্যবোধগুলো টিকিয়ে রাখতে তিনিসহ বেশ কয়েকজন বেঁচে যাওয়া মানুষ এই কনভেনশনের খসড়া তৈরি করেছিলেন।
ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড বেন-গুরিয়ন বলেছিলেন, "ইসরায়েলের ভাগ্য দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: তার শক্তি এবং তার ন্যায়পরায়ণতা।" ইসরায়েলের সামরিক নেতারা প্রায়ই এই উক্তিটি ব্যবহার করলেও তাদের বাস্তব কর্মকাণ্ডের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানবিক মূল্যবোধই হলো ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তি, যা একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগের তোয়াক্কা না করা কোনো উচ্ছৃঙ্খল রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে। সাহায্য কর্মীদের সুরক্ষার মাধ্যমেই বিশ্ব নিশ্চিত করতে পারে যে সংকটের সময়ে বেসামরিক নাগরিকরা সেবা পাবেন। রাশিয়া আমাদের মূল্যবোধকে অবজ্ঞা করছে তা দেখে আমরা হয়তো অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দাবি করা ইসরায়েলের কাছ থেকে এমন আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

