গত এক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দায়িত্বরত সিআইএ কর্মকর্তাদের মধ্যে এক রহস্যময় স্বাস্থ্য সমস্যার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যা ‘হাভানা সিনড্রোম’ বা দাপ্তরিক ভাষায় ‘অ্যানোমালাস হেলথ ইনসিডেন্টস’ (এএইচআই) নামে পরিচিত। এই সমস্যায় আক্রান্তদের মধ্যে তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঘোরানো, ভারসাম্যহীনতা, স্মৃতিভ্রম এবং দীর্ঘমেয়াদী স্নায়বিক ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা গেছে।
২০১৯ সালের এপ্রিলে লন্ডনে কর্মরত একজন জ্যেষ্ঠ সিআইএ কর্মকর্তার ওপর প্রথম বড় ধরনের আক্রমণের মতো অভিজ্ঞতার বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি জানান, ঘুমের মধ্যে তীব্র মাথাব্যথায় তার ঘুম ভেঙে যায় এবং এমন মনে হচ্ছিল যেন চোখের ভেতর কেউ ড্রিল চালাচ্ছে। পরবর্তীতে পোল্যান্ডেও তিনি একই ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হন। এই কর্মকর্তা রাশিয়া-বিরোধী বৈশ্বিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
হাভানা সিনড্রোমের উৎস নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। অনেকে একে রাশিয়ার গোয়েন্দা কার্যক্রম হিসেবে সন্দেহ করেন, যেখানে শব্দতরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ শক্তি ব্যবহার করে মার্কিন গোয়েন্দাদের অকার্যকর বা ভয় দেখানো হতো। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে একাধিকবার এটি ‘খুবই অসম্ভব’ বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও গত গ্রীষ্মে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদায়ী জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক সেই আগের প্রতিবেদন বাতিল করে দিয়েছেন, কারণ সেটিতে তথ্যের অসামঞ্জস্য ছিল।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড রেলম্যান, যিনি ২০২২ সালে এএইচআই নিয়ে সরকারি প্যানেল পরিচালনা করেছিলেন, তিনি মনে করেন এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অংশ পালস মাইক্রোওয়েভ শক্তির সংস্পর্শে আসার কারণেই ঘটেছে। সিআইএ এবং মার্কিন সরকারের একাংশের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন করার অভিযোগ তুলেছেন অনেকে। সিবিএস নিউজের দুই প্রযোজক মাইকেল রে এবং ওরিয়ানা জিল ডি গ্রানাদোস তাদের নতুন বইয়ে দাবি করেছেন যে, রাশিয়া অন্তত কিছু ঘটনার পেছনে জড়িত থাকতে পারে।
এই সিনড্রোমের শুরুর দিকে কিউবায় মার্কিন কূটনীতিকরা আক্রান্ত হয়েছিলেন। এরপর চীন, ভিয়েতনাম, সার্বিয়া, কিরগিজস্তান এবং জর্জিয়াতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে যারা রাশিয়ার স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছিলেন, তাদের মধ্যেই আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি ছিল। ১৯৯০-এর দশকে এনএসএ কর্মকর্তা মাইক বেকের অসুস্থতাকে এই সিরিজের আদি ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।
মার্ক পলিমারোপোলোস, যিনি ইউরোপ ও ইউরেশিয়ায় সিআইএ-র উপ-প্রধান ছিলেন, তিনিও মস্কো ভ্রমণের সময় এই সিনড্রোমে আক্রান্ত হন। তাকে ওয়াল্টার রিড মেডিকেল সেন্টারে ‘মাইল্ড ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি’ শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে ‘হাভানা অ্যাক্ট’-এর আওতায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
বিজ্ঞানীদের একাংশ একে ‘ম্যাস হিস্টিরিয়া’ বা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও, জেমস জিওর্দানোসহ অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, আক্রান্তদের শারীরিক লক্ষণগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি মার্কিন সরকার ডার্ক ওয়েব থেকে হাভানা সিনড্রোম সদৃশ একটি ডিভাইস উদ্ধার করেছে বলে জানা গেছে, যা পরীক্ষার পর প্রমাণিত হয়েছে যে এটি মানুষের শরীরে একই ধরনের উপসর্গ তৈরি করতে সক্ষম। এই নতুন প্রমাণগুলো রহস্যটিকে আরও ঘনীভূত করেছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একে এক বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

