বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনতে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে রাশিয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘোষণায় জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের পর এই সমঝোতা হয়েছে। এই সরবরাহ নিশ্চিত করতে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, পুতিনের সঙ্গে কথা বলার পরপরই রাশিয়া অবিলম্বে ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহে রাজি হয়েছে। এছাড়া আগামী নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং ডিসেম্বরে ১ লাখ টন ডিজেল বাজারে ছাড়া হবে। রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারগুলোর বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায়, বৈশ্বিক বাজারে রাশিয়ান ডিজেলের সরবরাহ সহজ করতে দেশটির জ্বালানি খাতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হচ্ছে। একই দিন ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পুতিন ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ক্রেমলিন জানায়, মার্কিন ও বৈশ্বিক বাজারে তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহে রাশিয়া তার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত সামগ্রিক বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা প্রকাশ করেন পুতিন।
ক্রেমলিন আরও জানায়, দুই রাষ্ট্রপ্রধানের আলোচনায় ইউক্রেন সংকট সমাধানের সম্ভাবনা, ইরান পরিস্থিতি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা দিক উঠে এসেছে। পাশাপাশি দুই দেশের প্রেসিডেন্ট, তাদের প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে এই সমঝোতার কঠোর সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এক বার্তায় তিনি বলেন, পুতিনকে কোনো উপহার দেওয়া হলে তা সভ্য বিশ্বে শান্তি বা কোনো সুবিধা আনবে না। রাশিয়া এই ডিজেলের বিনিময় পরবর্তীতে আরও সন্ত্রাস ও বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে ফিরিয়ে দেবে। রাশিয়ার কাছ থেকে পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি করা মানে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার পেছনে বিনিয়োগ করা। এখন যা প্রয়োজন তা হলো পারস্পরিক ভিত্তিতে রাশিয়ার সঙ্গে সত্যিকারের উত্তেজনা হ্রাস করা।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপকে ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসনের পর রাশিয়ার ওপর আরোপিত কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নীতি থেকে বড় ধরনের সরে আসা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমনকি গত মাসেই রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি থেকে আয় বন্ধ করতে বড় ক্রেতাদের ওপর চড়া শুল্ক আরোপের একটি বিলে স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্প।
শুক্রবার কোলম্বাস ডে উদযাপন উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প আগেভাগেই ডিজেল নিয়ে একটি বড় ঘোষণার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইটের প্রশংসা করে বলেন, আমরা ডিজেল পরিস্থিতির ওপর বড় আঘাত হানতে যাচ্ছি। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তারা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রেখেছেন এবং এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত কমে আসবে।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডিজেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এএএ-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৬.২৮ ডলারে, যা এক মাস আগে ছিল ৫.৯৪ ডলার এবং এক বছর আগে ছিল ৩.৬৮ ডলার। লেবার ডে ছুটির ঠিক আগে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালনে ৬ ডলার অতিক্রম করে এবং গত ২২ সেপ্টেম্বর এটি রেকর্ড ৬.৫৩ ডলারে পৌঁছায়। ট্রাক পরিবহন, কৃষি ও নির্মাণ খাতে ব্যাপক ব্যবহারের কারণে ডিজেলের মূল্যের প্রভাব পড়ে খাদ্যসামগ্রীসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর।
ডিজেলের আকাশচুম্বী দাম কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন একাধিক বিকল্প পথ পর্যবেক্ষণ করছে। চলতি সপ্তাহে এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে হাইওয়েতে রেড-ডাইড (লাল রঙের) ডিজেল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ ডিজেলের প্রতি গ্যালনে ২৪.৪ সেন্টের ফেডারেল কর থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত।
এছাড়া হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে বৃহস্পতিবার দাবি করেন ট্রাম্প। তিনি জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনী রাতে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যদিও সেখানে কিছু জাহাজে আক্রমণ চালিয়েছে ইরান। ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, হরমুজ প্রণালীতে আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং রাশিয়ার জ্বালানি সংক্রান্ত এই ঘোষণার ফলে আমেরিকানদের জন্য এবং পুরো বিশ্বের জন্য ডিজেলের দাম দ্রুত ও রেকর্ড পরিমাণে কমে আসবে। কৃষক, খামারি ও ট্রাকচালকদের জন্য মূল্যানুমান কমানোই তার প্রধান অগ্রাধিকার।

