ভোরের সূর্য ওঠার সাথে সাথেই রিও ডি জেনিরো থেকে রওনা দেয় বিলাসবহুল ইয়ট 'বোয়াভেনচুরা ২'। ইপানেমা সৈকত থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে পাথুরে কাগারাস দ্বীপপুঞ্জ পার হতেই পর্যটকদের চোখ আটকে যায় দিগন্তে। খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না তাদের। হঠাৎ একদল বোতলনোজ ডলফিনের জলকেলি আর বাতাসে ভেসে থাকা দুটি জলীয় বাষ্পের ফোয়ারা জানান দেয় কাঙ্ক্ষিত অতিথিদের উপস্থিতি—একজোড়া বিশালাকার কুঁজপিঠ ওয়ালা বা 'হাম্পব্যাক' তিমি। শ্বাস নেওয়ার জন্য শান্তভাবে ভেসে উঠে আবার লেজের নিচের অংশ দেখিয়ে গভীর পানিতে ডুব দেয় এই চমৎকার স্তন্যপায়ী প্রাণীরা।
ব্রাজিলের এই 'মার্ভেলাস সিটি' বা চমৎকার শহরের উপকূলে শীতকালে হাম্পব্যাক তিমিদের এমন আগমন এখন বেশ নিয়মিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে। একসময় শিকারিদের কারণে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া এই তিমিগুলো এখন নাটকীয়ভাবে ফিরে আসছে। এমনকি চলতি বছর রিওর গুয়ানাবারা উপসাগরের ভেতরেই একটি তিমিকে অন্তত ১৮ বার দেখা গেছে। কয়েক শতাব্দীর মধ্যে এই প্রথম উপসাগরের ভেতরে তিমির এমন ঘন ঘন উপস্থিতি গবেষকদের ধারণা দিচ্ছে যে, তিমিগুলো হয়তো তাদের শত বছরের পুরোনো চারণভূমিতে আবারও ফিরে আসছে।
পর্যটন সংস্থা 'আরওসি সেল'-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ইয়টের চালক থিও আন্দ্রেড বলেন, "এই দৃশ্যের কোনো মূল্য হয় না, এটি সম্পূর্ণ জাদুকরী।" উত্তর দিকের প্রজনন ক্ষেত্রগুলোতে তিমি দেখার অভিযান পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আন্দ্রেড চলতি বছর থেকে রিওতে নিজস্ব ট্যুর শুরু করেছেন। এই ট্যুরের একজন যাত্রী, ৫৩ বছর বয়সী পানীয় পাইকারি বিক্রেতা লুসিয়েন ডস সান্তোস বলেন, "আমি অবাক হয়ে যাই কীভাবে ৫০ টনের একটি প্রাণী এত সুন্দর লাফ দিতে পারে, যা সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। এটি সত্যিই প্রকৃতির এক অনন্য উপহার।"
ঐতিহাসিকভাবে, এই হাম্পব্যাক তিমিগুলো জুন থেকে নভেম্বরের মধ্যে দক্ষিণ আটলান্টিকের সাউথ জর্জিয়া এবং স্যান্ডউইচ দ্বীপপুঞ্জের চারণভূমি থেকে ব্রাজিলের উত্তর-পূর্ব উপকূলের অ্যাব্রোলহোস ব্যাংকের উষ্ণ ও অগভীর পানিতে প্রজননের জন্য পরিযান করে। ১৭৮০ সালের দিকে চিত্রশিল্পী লিয়েন্দ্রো জোয়াকিমের আঁকা ছবিতে গুয়ানাবারা উপসাগরে তিমি শিকারের দৃশ্য দেখা যায়, যা প্রমাণ করে তখন থেকেই এখানে নির্বিচারে তিমি শিকার চলত। ফলে ১৯৮৬ সালে বাণিজ্যিকভাবে তিমি শিকারের ওপর বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা জারির আগেই এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
'আমিলগোস দা জুবার্তে' (হাম্পব্যাকের বন্ধু) সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক থিয়াগো ফেরারি জানান, ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে ব্রাজিলের এই তিমি গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা কমে ১,০০০-এরও নিচে নেমে এসেছিল। তবে বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৩৫,০০০-এ দাঁড়িয়েছে। ব্রাজিলের জলসীমায় সাউদার্ন রাইট হোয়েল এবং ব্রাইডস হোয়েল সহ বেশ কিছু প্রজাতির তিমি দেখা গেলেও, ১৫ মিটার দীর্ঘ হাম্পব্যাক তিমিগুলো তাদের চমৎকার শারীরিক কসরতের জন্য সবার চেয়ে আলাদা এবং আকর্ষণীয়।
'ইলহাস দো রিও' (আইল্যান্ডস অব রিও) গবেষণা প্রকল্পের সামুদ্রিক বিজ্ঞানী লিলিয়ান লোদি ২০১৪ সালে প্রথম রিওর জলসীমায় হাম্পব্যাক তিমি নথিভুক্ত করেন। এরপর থেকে এই অঞ্চলে তিমি দেখার হার অনেক বেড়েছে। লোদি জানান, রিও মূলত একটি যাতায়াতের পথ হলেও এখন এখানে প্রজনন ক্ষেত্রের মতো আচরণ দেখা যাচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে নবজাতক বাছুর, পুরুষ তিমিদের প্রতিযোগিতা এবং তাদের সুরেলা গান। চলতি বছর গুয়ানাবারা উপসাগরে দেখা যাওয়া তিমিটি নিয়ে গবেষণা করে তিনি জানান, এটি একটি কিশোর তিমি, যা জুনের মাঝামাঝি থেকে এই শান্ত পানিতে বসবাস করছে এবং স্থানীয় কায়াক চালকদের আনন্দ দিচ্ছে।
বিজ্ঞান ও পর্যটনের এই মেলবন্ধনকে গবেষকরা তিমি সংরক্ষণের একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন। আরওসি সেল-এর ইয়টে কর্মরত পরিবেশ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মারিয়ানা বুয়েনো পর্যটকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করেন। তিনি তিমিদের থেকে অন্তত ১০০ মিটার দূরত্ব বজায় রাখা এবং ৩০ মিনিটের বেশি সময় একই তিমির কাছাকাছি না থাকার নিয়ম নিশ্চিত করেন। এই সংগৃহীত তথ্য গবেষণার জন্য 'আমিলগোস দা জুবার্তে' প্রকল্পে পাঠানো হয়, যা তিমিদের আচরণ বুঝতে এবং নতুন আইন প্রণয়নে সাহায্য করে।
তবে পর্যটন বাড়ার কারণে তিমিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানী লিলিয়ান লোদি। তিনি সতর্ক করে বলেন, তিমিদের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে মানুষের সাথে তাদের সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়ছে। মাছ ধরার জাল, পর্যটকবাহী নৌকার ভিড়, বড় বড় জাহাজ চলাচল এবং রাসায়নিক ও শব্দ দূষণ তিমিদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রাজিলে তিমি সুরক্ষায় কঠোর আইন থাকলেও লোদির মতে, আইনগুলোর আধুনিকায়ন এবং সঠিক তদারকি প্রয়োজন। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে এই বুদ্ধিমান প্রাণীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

