ভারতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তিতে এক বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনকে প্রভাবিত করা মে মাসের পরীক্ষা কেলেঙ্কারির জেরে এই পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ এবং কোনো আন্দোলনের মুখে নতিস্বীকার না করার যে দৃঢ় ভাবমূর্তি মোদি গড়ে তুলেছিলেন, শিক্ষামন্ত্রীর এই পদত্যাগ সেখানে এক বিরল ও বেদনাদায়ক পরাজয়।
'ককরোচ জনতা পার্টি'র (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে কটাক্ষ করে বলেন, "আমরা সবাই মিলে এটি সম্ভব করেছি। তারা কী বলত? এই সরকারের অধীনে নাকি কোনো পদত্যাগ হয় না!" এদিকে, দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর অবস্থান, টিয়ার গ্যাস উপেক্ষা করে পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল এবং "মোদি হটাও" স্লোগানের মাঝেও দীর্ঘদিন নীরব ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ জানান, গত ২৩ জুলাই গভীর রাতে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে মোদি অবশেষে নীরবতা ভাঙলেও, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী বা তাদের ওপর পুলিশের নির্মম নির্যাতনের বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি।
দ্য কুইন্ট-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষক আদিত্য মেনন উল্লেখ করেন, আন্দোলনের লক্ষ্য এখন স্পষ্টভাবেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান থেকে সরে সরাসরি মোদির দিকে চলে গেছে। সরকারের নীতি অনুযায়ী ভুল স্বীকার না করার যে ঐতিহ্য ছিল, প্রধানকে সরিয়ে দেওয়া তার একটি বড় ব্যতিক্রম। ২০২০ সালে প্রায় ১৮ মাসব্যাপী কৃষক আন্দোলনের পর সরকার পিছু হটেছিল, তবে এবার সরকার অনেক দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। দ্য প্রিন্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনকে পাত্তা না দেওয়ার যে কৌশল মোদি সরকার নিয়েছিল তা ব্যর্থ হয়েছে এবং এটি প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিতে "ফাটল" তৈরি করেছে। এমনকি বিজেপির অভিভাবক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) রতন শার্দা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দলের মিডিয়া ও যোগাযোগ টিমের তীব্র সমালোচনা করে একে "চরম ব্যর্থতা" বলে অভিহিত করেছেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার ১২ বছর ১ মাস ২৪ দিন পর এই প্রথম দেশের রাজধানীতে ক্যামেরার সামনে ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতে নির্ভয়ে স্লোগান উঠেছে— "মোদির পদত্যাগ চাই"। সংবাদমাধ্যমটির মতে, ভয়ের পরিবেশ এখন উল্টে গেছে; এখন আর আন্দোলনকারীরা সরকারকে ভয় পাচ্ছে না, বরং সরকারই আন্দোলনকারীদের ভয় পেতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহে মোদির বাসভবন অভিমুখে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় সাময়িকভাবে আটক হওয়া বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন, যারা শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জের নির্দেশ দিয়েছে তাদের জবাবদিহি করতে হবে এবং মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। তবে মোদি এখনো কোনো ক্ষমা চাননি। শিক্ষামন্ত্রী বিদায় নিলেও ভারতের রাজনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তন এসেছে, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়।

