দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলায় একজন নিহত এবং অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে "যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘনের" প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
লেবাননের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিবনিন শহরের একটি কবরস্থানে অবস্থিত প্রার্থনা কক্ষের ছাদে ইসরায়েলি হামলা আঘাত হানলে এক ব্যক্তি নিহত হন এবং আরও ১২ জন আহত হন। এছাড়া পশ্চিমাঞ্চলীয় মানসুরি শহরেও হামলার খবর পাওয়া গেছে, যেখানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক মাসেরও বেশি সময় পর তাদের প্রথম উচ্ছেদ নির্দেশ জারি করেছে।
বুধবার বিকেলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে "সুনির্দিষ্ট হামলা" শুরুর ঘোষণা দেয়। এর মাত্র ৩০ মিনিট আগে তাদের আরবি ভাষার মুখপাত্র মানসুরির বাসিন্দাদের জোরপূর্বক সামরিক অভিযানের আশঙ্কায় এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। উভয় বিবৃতিতে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হলেও বিস্তারিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি সূত্র স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, মানসুরির বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা লেবানন সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাদের শহরে ফিরে এসেছিল, যা চুক্তির লঙ্ঘন করে সেখানে একটি চেকপোস্ট স্থাপন করেছিল। সূত্রটি আরও দাবি করেছে, শহরটি ইসরায়েল ঘোষিত ১০ কিলোমিটার গভীর "নিরাপত্তা অঞ্চলের" ভেতরে অবস্থিত এবং সেখানে বেসামরিক নাগরিকদের জীবন বিপন্নকারী সামরিক কার্যক্রম চলছিল।
গত ১৪ জুনের পর দক্ষিণ লেবাননে এটিই প্রথম উচ্ছেদ নির্দেশ। এর আগে গত জুনের শেষদিকে একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর অধীনে চুক্তি হয়েছিল যে, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রকরণের বিনিময়ে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের অধিকৃত অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করবে। হিজবুল্লাহ এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল, সেনা প্রত্যাহারের সাথে নিরস্ত্রকরণের শর্ত যুক্ত করা সব ধরনের "লাল রেখা" অতিক্রম করেছে। তবে দুই সপ্তাহ আগে জাওতার আল-গারবিয়াহ গ্রাম থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানে প্রথম পরীক্ষামূলক অঞ্চল হিসেবে লেবানন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল।
মানসুরির মেয়র হায়দার মাদিহলি স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো শহরের উপকণ্ঠে ঘাজালেহ এলাকার বেশ কিছু ভবন ও ভিলায় চারটি হামলা চালিয়েছে, যার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই হামলার পর স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের জিনিসপত্র গাড়িতে নিয়ে দক্ষিণের বৃহত্তম শহর টায়ারের দিকে পালাতে শুরু করেছেন। তিনি আরও জানান, গত ১৯ জুনের যুদ্ধবিরতির পর প্রায় ১২০টি পরিবার মানসুরিতে ফিরেছিল, কিন্তু হামলা বাড়ার কারণে বর্তমানে মাত্র ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার সেখানে রয়ে গেছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক কার্যালয় জানিয়েছে, সংঘাত কমে আসার পর লেবাননে বাস্তুচ্যুত হওয়া ৮ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে। তবে এখনও প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে, যার মধ্যে ২৬ হাজার সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছে।
গত ২ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালালে লেবানন এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এরপর ইসরায়েল লেবাননজুড়ে বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে এ পর্যন্ত অন্তত ৪,৩৩৩ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৩৯২ জন নারী এবং ২৫৩ জন শিশু রয়েছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩৫৩ জনের মৃত্যুর রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, এই সংঘাতে তাদের ৩৮ জন সেনা এবং ৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

