ক্যারোলিন লেভিট যখন প্রথমবার হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং রুমে পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তার কোলে মাত্র সাড়ে ১০ সপ্তাহের নবজাতক কন্যা। এক হাতে কফির কাপ এবং অন্য হাতে একটিমাত্র কাগজ নিয়ে তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। প্রথম ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক যখন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কীভাবে তিনি দুই বছরের ছেলে এবং সদ্যজাত কন্যাকে সামলে এই কঠিন ক্যারিয়ার বজায় রাখছেন, লেভিট হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, এর কোনো গোপন সূত্র নেই, শুধু প্রতিদিন লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। পোডিয়ামের দিকে তাকিয়ে হেসে তিনি বলেছিলেন, "আমার স্বামীকে ধন্যবাদ, যিনি এই মুহূর্তে ঘরে আমাদের সন্তানদের দেখভাল করছেন। আমি কাজ শেষে তাদের কাছে ফেরার অপেক্ষায় থাকি, তবে এটি সত্যিই অনেক চ্যালেঞ্জিং।" কিন্তু এই ব্রিফিংয়ের মাত্র এক মাসের মাথায় তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
লেভিটের এই বিদায় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত সাত বছরে তিনি চতুর্থ হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারি, যিনি পরিবারের পেছনে সময় দেওয়ার জন্য এই হাই-প্রোফাইল চাকরি ছেড়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন—উভয় প্রেসিডেন্টের আমলেই নারী প্রেস সেক্রেটারিদের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা গেছে। ইউএসএ টুডে-র একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব মায়েরা হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা অন্যদের (যাদের ছোট সন্তান নেই বা যারা বাবা) তুলনায় গড়ে এক বছর কম সময় এই পদে টিকে থাকতে পেরেছেন।
কর্মক্ষেত্র বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি আসলে পুরো মার্কিন কর্মক্ষেত্রেরই একটি বাস্তব চিত্র। ইউনিভার্সিটি অব কানসাসের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩ লাখ ৪১ হাজার মা কর্মক্ষেত্র ছেড়েছেন। ক্যাটালিস্টের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার বিষয়টিই নারীদের কর্মক্ষেত্র ছাড়ার প্রধান কারণ। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ক্লডিয়া গোল্ডিন এই ধরনের উচ্চ বেতনের কিন্তু দীর্ঘ সময় দাবি করা কাজগুলোকে ‘গ্রিডি জবস’ বা ‘লোভনীয় অথচ শোষণমূলক চাকরি’ বলে অভিহিত করেছেন। ২০২৬ সালে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির বার্ষিক বেতন ১ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ ডলার হলেও, এর জন্য দিতে হয় সীমাহীন সময়।
হোয়াইট হাউসের সাবেক প্রেস সেক্রেটারি আরি ফ্লেশার জানান, তিনি যখন জর্জ ডব্লিউ বুশের অধীনে কাজ করতেন, তখন তার কোনো সন্তান ছিল না। তিনি বলেন, "তখন আমার সন্তান থাকলে আমি কীভাবে এই কাজ করতাম জানি না। ক্যারোলিন এবং অন্যরা কীভাবে এটা সামলেছেন, তা আমার মাথায় আসে না।" ফ্লেশারের কাজের সময়সূচী ছিল অত্যন্ত কঠিন—ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে খবর পড়া, সকাল ৭টায় সিনিয়র স্টাফদের বৈঠক এবং রাত ৮টায় বাড়ি ফেরা, সাথে শনি ও রবিবারেও কাজ করতে হতো। ২০১৩ সালের কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, একটি ছোট শিশু গড়ে সকাল ৬টা ৪৪ মিনিটে ঘুম থেকে ওঠে এবং রাত ৮টা ১৫ মিনিটে ঘুমাতে যায়। ফলে এই ধরনের ব্যস্ত সময়সূচীর কারণে অনেক অভিভাবকই সন্তানদের রাতের খাবার বা ঘুমানোর সময় পাশে থাকতে পারেন না।
বারাক ওবামার প্রেস সেক্রেটারি জে কার্নি এই পদে ৪০ মাস ছিলেন। তার সন্তানরা তখন ছোট ছিল। কার্নি জানান, ওবামা তার পরিবারের প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন, তবুও ওবামার বিদায় ঘোষণার সময় জানা যায় যে কার্নি তার মেয়ের লিটল লিগ খেলা দেখারও সময় পাচ্ছিলেন না। কার্নি বলেন, "আমি একজন বাবা হিসেবে যতটা সম্ভব উপস্থিত থাকার চেষ্টা করেছি, কিন্তু একজন মায়ের জন্য এটি আরও কতখানি কঠিন হতে পারে তা আমি সহজেই বুঝতে পারি।"
হোয়াইট হাউসের ইতিহাসে এ পর্যন্ত ৩৭ জন প্রেস সেক্রেটারি দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে ২০১৭ সালের আগে মাত্র দুজন বাদে সবাই ছিলেন পুরুষ। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্স দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই ধারা বদলে যায়। স্যান্ডার্স যখন কাজ শুরু করেন, তখন তার তিনটি ছোট সন্তান ছিল, যার মধ্যে বড়টির বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর। তিনি ২৩ মাস এই পদে ছিলেন। স্যান্ডার্স পরে আরকানসাসের গভর্নর নির্বাচিত হন। তিনি বলেন, গভর্নর হিসেবে তিনি নিজের সময় নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, যা হোয়াইট হাউসে সম্ভব ছিল না। গভর্নর হিসেবে তিনি সরকারি কর্মচারীদের জন্য ১২ সপ্তাহের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং কর্মক্ষেত্রে শিশু রাখার নমনীয় নীতি চালু করেন। স্যান্ডার্স তার রাজনৈতিক জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, ট্রাম্পের অধীনে কাজ করার কারণে তাকে রেস্তোরাঁ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল এবং তার ৩ বছরের ছেলের স্কুলের সামনে তার গাড়িতে থুতু ফেলা হয়েছিল।
স্যান্ডার্সের পর স্টেফানি গ্রিশাম এবং কেইলি ম্যাকএনানি এই দায়িত্ব পালন করেন। গ্রিশাম তার এক সন্তানকে অন্য রাজ্যে রেখে কাজ করতেন এবং পরে মেলানিয়া ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন যাতে তিনি সন্তানকে নিজের কাছে রাখার জন্য বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ পান। অন্যদিকে, ম্যাকএনানি ২০২০ সালের এপ্রিলে যখন দায়িত্ব নেন, তখন তার মেয়ের বয়স ছিল মাত্র ৪ মাস। তার স্বামী একজন পেশাদার বেসবল খেলোয়াড় হওয়ায় প্রায়ই ভ্রমণের ওপর থাকতেন। ম্যাকএনানি জানান, চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করার চাপের কারণে সন্তানকে সময় দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
জো বাইডেনের আমলে জেন সাকি ১৫ মাস দায়িত্ব পালনের পর এমএসএনবিসি-তে যোগ দেন। তিনি বলেছিলেন, "আমি আমার সন্তানদের ফুটবলের অনুশীলন বা ব্যালে নাচের অনুষ্ঠান—কোনো কিছুই মিস করতে চাই না।" সাকির পর কারিন জঁ-পিয়েরে ৩২ মাস এই পদে ছিলেন, যা নারীদের মধ্যে দীর্ঘতম। কিন্তু বিদায়ের দিনে তিনিও আবেগাপ্লুত হয়ে তার মেয়ের উদ্দেশ্যে বলেন, "তুমি অনেকগুলো রাত আমাকে ছাড়া কাটিয়েছ, স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার সময় বা তোমার যেকোনো প্রয়োজনে তোমার মা পাশে থাকতে পারেনি।"
ক্যারোলিন লেভিট ২০২৬ সালের ১ মে সন্তান জন্ম দিয়ে ইতিহাস গড়েন, কারণ তিনিই প্রথম হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি যিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় মা হয়েছেন। পেনসিলভানিয়ার বাটলারে ট্রাম্পের ওপর হামলার মাত্র চার দিন আগে তিনি মা হয়েছিলেন, কিন্তু ঘটনার পরপরই তিনি কাজে ফেরেন। সন্তান জন্মের মাত্র সাত সপ্তাহ পর তিনি ট্রাম্পের সাথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে ভ্রমণ শুরু করেন এবং ১৬ জুলাই প্রথম ব্রিফিংয়ে অংশ নেন। কর্মক্ষেত্র বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যামি বিকম জানান, যুক্তরাষ্ট্রে মায়েরা সাধারণত সন্তান জন্মের ৭ থেকে ১১ সপ্তাহের মধ্যে কাজে ফেরেন, কিন্তু কাজের পরিবেশ নমনীয় না হলে অনেকেই দ্রুত চাকরি ছেড়ে দেন।
লেভিট সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "একজন কর্মজীবী মা হিসেবে প্রতিটি দিনই একটি বড় পরীক্ষা। আপনাকে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হবে, সময়ের সঠিক অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। এমনকি প্রতি রাতে সন্তানদের ঘুমানোর সময় পাশে থাকার জন্য অনেক বড় সুযোগকেও ‘না’ বলতে হবে।" হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর লেভিট তার নিজ রাজ্য নিউ হ্যাম্পশায়ারে ছুটি কাটাবেন এবং পরবর্তীতে ট্রাম্পের একটি সুপার পিএসি (PAC)-তে যোগ দেবেন। সাবেক প্রেস সেক্রেটারি জেন সাকি এবং কেইলি ম্যাকএনানি লেভিটের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের সাবেক রিপোর্টার অ্যান কম্পটন বলেন, একসময় পুরুষেরা কোনো বিতর্ক ঢাকতে বলতেন যে তারা পরিবারের জন্য চাকরি ছাড়ছেন, কিন্তু এখন নারীরা গর্বের সাথে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং লেভিটের এই সিদ্ধান্তে কোনো অনুশোচনা থাকবে না।
