ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের কাছে ভয়াবহ রুশ হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন। কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় রাশিয়ার ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটিও প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিমা মিত্রদের ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে বিলম্বের কারণেই একের পর এক তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানান, রাতভর ইউক্রেন লক্ষ্য করে ১১৫টি ড্রোন এবং ২৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে মস্কো। আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী বেশিরভাগ ড্রোন ভূপাতিত করতে পারলেও ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটিও রুখতে পারেনি। কিয়েভের নিকটবর্তী কভিতনেভা রেলওয়ে স্টেশনের কাছে এই হামলার ধ্বংসযজ্ঞ স্পষ্ট দেখা গেছে। সেখানে রেললাইন নাকি পাশের গুদামটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। হামলার ১২ ঘণ্টা পরও একটি গুদামে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছিল। স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলতে দেখা গেছে উদ্ধারকর্মীদের。
কভিতনেভা স্টেশনের কাছেই বাস করেন আনাস্তাসিয়া ডুডলি। হামলায় তাঁর তিনতলা বাড়িটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আনাস্তাসিয়া এবং তাঁর মা কোনোমতে বেঁচে গেছেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরুর পর থেকে এটিই তাঁর জীবনের "সবচেয়ে ভয়াবহ রাত" ছিল বলে জানান আনাস্তাসিয়া। তিনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার কয়েক ঘণ্টা আগে একটি ড্রোন তাঁর বাড়িতে আছড়ে পড়ে, যার ফলে বাড়ির ছাদ ও তৃতীয় তলা পুরোপুরি উড়ে গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী) ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করে আসছে। তবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব মজুত থেকে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে এবং এখন তারা নতুন করে সরবরাহ করতে দ্বিধাবোধ করছে। গত জুলাইয়ের শুরুতে ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও, গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা অস্বীকার করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের প্রযুক্তি সহজে হাতছাড়া করার কোনো চুক্তি করেনি।
ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের এই তীব্র সংকটের কারণে ইউক্রেনের আকাশ এখন প্রায় অরক্ষিত। গত সপ্তাহে অন্য একটি হামলায় ২৭টি রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে মাত্র একটি ধ্বংস করতে পেরেছিল ইউক্রেন। সে সময়ও জেলেনস্কি সতর্ক করেছিলেন যে, ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি রাশিয়াকে আরও প্রাণঘাতী হামলা চালাতে উৎসাহিত করছে। বুধবার তিনি আবারও সরাসরি বলেন, "ইউক্রেনের মানুষের জীবন পুরোপুরি ইউরোপ ও আমেরিকার অংশীদারদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।" এই বিষয়ে তিনি ন্যাটো প্রধান মার্ক রুট-এর সঙ্গেও কথা বলেছেন।
ইউক্রেনের কাছে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলোতে ব্যবহারের জন্য ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র সংকট রয়েছে। প্রতিটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে অন্তত দুটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হয়। এই ব্যবস্থার আওতা প্রায় ১৬০ কিলোমিটার। অন্যদিকে রাশিয়া প্রতিটি বড় হামলায় গড়ে ২০ থেকে ৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। ইউক্রেনের সামরিক বিশ্লেষক ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইভান স্তুপাক এই পরিস্থিতিকে একটি দামি গাড়ির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, "মনে করুন আপনার গ্যারেজে একটি ল্যাম্বরগিনি গাড়ি আছে, কিন্তু তাতে কোনো জ্বালানি নেই। গাড়িটি বিশ্বের অন্যতম সেরা হলেও আপনি সেটি চালাতে পারছেন না। প্যাট্রিয়টের অবস্থাও ঠিক তেমন।"
ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের অভাবে খোদ প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থাগুলোই এখন রাশিয়ার প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন স্তুপাক। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র না পাওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থাগুলোকে আড়ালে বা অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া জরুরি, অন্যথায় এগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এদিকে, হামলার পরপরই কভিতনেভা রেলওয়ে স্টেশনের বিদ্যুৎ লাইন মেরামতের কাজ শুরু করে দিয়েছেন কর্মীরা, যাতে দ্রুত ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত এই ধ্বংসলীলার মাঝেও ইউক্রেনীয়রা দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন, তবে তাঁদের মাথার ওপর এখনো ঝুলছে যেকোনো মুহূর্তে নেমে আসা মৃত্যুর ছায়া।

