জার্মানির লাইপজিগ বিমানবন্দরে ইউক্রেনীয় কার্গো বিমানের কাছাকাছি একটি সশস্ত্র ড্রোন উদ্ধার করা হয়েছে। ড্রোনটি বিস্ফোরিত না হলেও, এটি যেভাবে বিমানবন্দরের সুরক্ষিত সীমানা পেরিয়ে ইউক্রেনীয় বিমানের এত কাছে চলে এসেছে, তা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও এই ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে প্রাথমিক সমস্ত প্রমাণ রাশিয়ার দিকেই ইঙ্গিত করছে। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে অনেক দূরে ইউরোপের বুকে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন উদ্ধারের ঘটনা এটিই প্রথম।
জার্মান সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ইউক্রেনীয় যুদ্ধক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত কোয়াডকপ্টার ডিজাইনের একটি ডরোনের সাথে একটি প্যাকেট সংযুক্ত ছিল। ড্রোনটি হলুদ ও নীল রঙের ইউক্রেনীয় আন্তোনভ কার্গো বিমানের মাত্র কয়েক মিটার দূরে পড়ে ছিল। স্যাক্সনি রাজ্যের পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, বিমানবন্দরের দক্ষিণ রানওয়ের কাছে নিরাপদ কার্গো অপারেশন এলাকায় কর্মরত এক কর্মচারী ড্রোনটি খুঁজে পান, যাতে একটি অজানা বিস্ফোরক ডিভাইস ছিল।
জার্মান গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডরোনে থাকা বোমাটি পিইটিএন (PETN) এবং সেমটেক্স প্লাস্টিক বিস্ফোরক দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। লকার্বির ওপর প্যান আম ১০৩ বিমানে বিস্ফোরণে এই সেমটেক্স বিস্ফোরকই ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে ডেটোনেটর বা ফিউজে ত্রুটি থাকায় লাইপজিগের বোমাটি বিস্ফোরিত হয়নি। স্থানীয় পত্রিকা 'লাইপজিগার ভক্সসাইটুং' জানিয়েছে, পুলিশ সেখানে প্রায় ৮০০ গ্রাম বিস্ফোরক খুঁজে পেয়েছে। ক্র্যানফিল্ড ইউনিভার্সিটির বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ট্রেভর লরেন্স বলেন, বিমান ধ্বংস করার জন্য এই পরিমাণ বিস্ফোরকই যথেষ্ট, কারণ বিমানের বডি অত্যন্ত পাতলা হয়, যা সাধারণত মাত্র ৩ মিলিমিটার অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি। প্লাস্টিক বিস্ফোরক সাধারণত সামরিক বাহিনী বা বড় কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছেই থাকে, কোনো শখের ড্রোন চালকের পক্ষে এটি সংগ্রহ করা অসম্ভব।
এই ঘটনার পরপরই বিমানবন্দরের আকাশে কয়েকশো মিটার উঁচুতে ডিএইচএল (DHL) কার্গো বিমানের সাথে আরেকটি অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তুর সংঘর্ষ ঘটে, যা আরেকটি ড্রোন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সংঘর্ষে বিমানটির সামান্য ক্ষতি হয়েছে। লাইপজিগ বিমানবন্দরটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি স্থান। এটি ইউক্রেনীয় আন্তোনভ জেটের ইউরোপীয় ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা ভারী পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত। এছাড়া ন্যাটো এবং জার্মান সামরিক বাহিনীও এই বিমানবন্দরটি ব্যবহার করে। ইউক্রেনীয় বিমানের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, এটি হয়তো কিয়েভে সামরিক ও বেসামরিক রসদ সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ন্যাটো জানিয়েছে তারা বুধবারের এই ঘটনা সম্পর্কে অবগত আছে। তবে একটি কৌশলগত বিমানবন্দরে ড্রোন প্রবেশ ঠেকাতে ন্যাটোর ব্যর্থতা নজর কেড়েছে। এর আগেও ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এই বিমানবন্দরে ডিএইচএল-এর মাধ্যমে পাঠানো একটি ফায়ারবোম বিস্ফোরিত হয়েছিল। ইউরোপজুড়ে তদন্তে লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ডে ২২ জন সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করা হয়, যারা রুশ গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছিল বলে সন্দেহ করা হয়। এছাড়া গত সেপ্টেম্বরে প্রায় ২০টি নিরস্ত্র রুশ ডেল্টা-উইং গেরবেরা ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। থিঙ্কট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (IISS)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্রেমলিন ইউরোপের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালাচ্ছে।
আইআইএসএস-এর সিনিয়র ফেলো চার্লি এডওয়ার্ডস বলেন, ত্রুটিপূর্ণ ডেটোনেটরসহ বিস্ফোরকবাহী ড্রোনের এই ঘটনাটি আগের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। এটি খুঁজে পাওয়ার জন্য নয়, বরং বিস্ফোরণ ঘটানোর উদ্দেশ্যেই পাঠানো হয়েছিল।

