ডারবান টেস্টের দ্বিতীয় দিনে ম্যাট রেনশর ক্যারিয়ার সেরা ১৯০ রানের মহাকাব্যিক ইনিংসে ভর করে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়া। একপর্যায়ে ১২৪ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়া সফরকারীরা শেষ পর্যন্ত অলআউট হওয়ার আগে ৩৯০ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করায়। নিচের সারির ব্যাটারদের নিয়ে শেষ ৪ উইকেটে রেনশ যোগ করেন ২৬৬ রান। জবাবে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ১ উইকেটে ২৭ রান তুলে দিন শেষ করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা, তারা এখনো ৩৬৩ রানে পিছিয়ে রয়েছে। আলো স্বল্পতার কারণে দ্বিতীয় দিনের খেলা নির্ধারিত সময়ের আগেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।
দিনের শুরুতে ৬ উইকেটে ১৮৭ রান নিয়ে খেলা পুনরায় শুরু করেন রেনশ ও অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। দুই ব্যাটার সিঙ্গেলস নিয়ে স্ট্রাইক রোটেট করার পাশাপাশি মাঝে মধ্যে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁদের মধ্যে গড়ে ওঠা ৯৬ রানের জুটির পতন ঘটান উইয়ান মুল্ডার। মুল্ডারের বাইরের দিকে সুইং করা বল খোঁচা দিতে গিয়ে দ্বিতীয় স্লিপে ক্যাচ দেন ৪৩ রান করা অজি অধিনায়ক। দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় নতুন বল নেওয়ার পরপরই মুল্ডার নিজের চতুর্থ শিকার বানান মিচেল স্টার্ককে, যার ফলে উইয়ান মুল্ডারের বোলিং ফিগার দাঁড়ায় ৬৮ রানে ৪ উইকেট।
স্টার্ক দ্রুত বিদায় নিলে ২৫০ রানের আগেই অস্ট্রেলিয়া গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়ে। ঠিক সেই সময়ে একপ্রান্ত আগলে রেখে স্ট্রাইক নিজের কাছে রাখার চেষ্টা করেন রেনশ, আর অন্যপ্রান্তে তাঁকে শক্ত সঙ্গ দেন নাথান লায়ন। রেনশ দারুণ রিস্ট ওয়ার্কের সাহায্যে লেগ সাইডে বাউন্ডারি তুলে নেন এবং এনরিখ নরকিয়াকে টানা দুটি চার মেরে দলের রান ২৫০ পার করান। এরপর নরকিয়াকে মিড-উইকেট দিয়ে দুর্দান্ত ফ্লিক শটে বাউন্ডারি মেরে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় এবং গত নয় বছরেরও বেশি সময়ে প্রথম টেস্ট শতক পূর্ণ করেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। প্রথম সেশনে ৯০ রান তুলে ২ উইকেট হারানো অজিদের সংগ্রহ মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ২৩৭ রান, তখন রেনশ ও লায়নের জুটি ছিল ৪৭ রানের।
বিরতির পর দ্বিতীয় সেশনে দক্ষিণ আফ্রিকান বোলারদের আরও হতাশ করে নিজেদের জুটি ১০০ পার করেন রেনশ ও লায়ন, আর দল পৌঁছায় ৩০০ রানের ঘরে। কেশব মহারাজকে রিভার্স সুইপ করে চার মেরে রেনশ ১৫০ রান স্পর্শ করেন। অপরপ্রান্তে লায়ন ৯২ বলে ৫টি চারে ২৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাদের ১৩৪ রানের এই জুটিটি দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্টে নবম উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ রানের জুটি। সাউথ আফ্রিকা উইকেটের খোঁজে আইডেন মার্করামের খণ্ডকালীন অফ-স্পিনও কাজে লাগায়, তবে সাফল্য মেলেনি। অবশেষে ১২৯তম ওভারে মারকো জানসেন এই জুটির অবসান ঘটান। জানসেনের ফুল লেংথ বলে ফ্রন্টফুটে আটকে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন লায়ন। লায়ন রিভিউ নিলেও বল ট্র্যাকিংয়ে দেখা যায় বল মিডল স্ট্যাম্পে আঘাত করছিল। জানসেন ৬৮ রানে ৩ উইকেট নিয়ে বোলিং শেষ করেন।
সতীর্থ বিদায় নিলেও রেনশ তাঁর মহাকাব্যিক ইনিংস চালিয়ে যান। নরকিয়াকে একটি ছক্কা ও চার মেরে তিনি নিজের আগের সেরা টেস্ট রানকে ছাড়িয়ে যান। চা বিরতির আগে দ্বিতীয় সেশনে অস্ট্রেলিয়া ১১৩ রান যোগ করে এবং রেনশ চা বিরতিতে যাওয়ার সময় ২১টি চার ও ১টি ছক্কায় ১৯০ রানে অপরাজিত ছিলেন। কিন্তু চা বিরতির পর দ্বিতীয় বলেই থামে তাঁর ইনিংস। সাইমন হারমারের অফ স্ট্যাম্পের বাইরের ফ্লাইট দেওয়া বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে প্রথম স্লিপে আইডেন মার্করামের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। ফলে মাত্র ১০ রানের জন্য দ্বিশতক বঞ্চিত হন এই অজি ওপেনার। ৩৯৭ বলের ইনিংসে তিনি হাঁকান ২১টি চার ও ১টি ছক্কা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্টে কোনো অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারের বল খেলার দিক থেকে রেনশর ৩৯৭ বল মোকাবেলা করাটি তৃতীয় দীর্ঘতম ইনিংস। এছাড়া ১২৫ রানের কমে ৬ উইকেট হারানোর পর যে কোনো দলের করা ৩৯০ রানটি দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সর্বোচ্চ দলগত সংগ্রহ।
জবাবে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ইনিংসের তৃতীয় ওভারেই জশ হ্যাজেলউডের স্ট্যাম্পের বাইরের বল তাড়া করতে গিয়ে তৃতীয় স্লিপে বো ওয়েবস্টারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ৩ বলে শূন্য রানে সাজঘরে ফেরেন ওপেনিং ব্যাটার রায়ান রিকেলটন। এর পরপরই স্টার্কের বলে আইডেন মার্করামের বিরুদ্ধে এলবিডব্লিউয়ের জোরালো আবেদন করে অজিরা। আম্পায়ার সাড়া না দিলে রিভিউ নেন প্যাট কামিন্স, কিন্তু রিপ্লেতে দেখা যায় বল ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগেছিল, ফলে রিভিউ নষ্ট হয় অস্ট্রেলিয়ার। এরপর আইডেন মার্করাম (১৫ অপরাজিত) ও ডেভিড বেডিংহাম কিছু বাউন্ডারি মেরে ইনিংস সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে আলো কমে এলে ৮.৪ ওভার খেলা হওয়ার পর দিনের খেলা বন্ধ ঘোষণা করেন আম্পায়াররা। দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ দাঁড়ায় ১ উইকেটে ২৭ রান।

