পিরিয়ডের সময় অনেকেরই তলপেটে ব্যথার পাশাপাশি হজমের সমস্যা বা বারবার মলত্যাগের প্রবণতা দেখা দেয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে 'পিরিয়ড পপ' হিসেবে অভিহিত করা হয়। ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি বিষয়ক গবেষক টেলর জাডকিন্স গত এক দশক ধরে এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন। তার মতে, পিরিয়ড এবং হজমজনিত অস্বস্তি প্রায়ই একসঙ্গে ঘটে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭৩ শতাংশ সুস্থ প্রাক-রজোনিবৃত্তির নারীরা পিরিয়ডের আগে বা চলাকালীন সময়ে অন্তত একটি উল্লেখযোগ্য গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল উপসর্গের কথা জানিয়েছেন। পেটে ব্যথা ও ডায়রিয়া সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হলেও অনেকের ক্ষেত্রে বমি ভাব ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাও দেখা যায়।
এই সমস্যার মূলে রয়েছে জরায়ু। পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরনের মাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে যায়, যা জরায়ুর আস্তরণ ভাঙার সংকেত দেয়। একই সময়ে জরায়ুর কোষগুলো 'প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন' নামক হরমোন-সদৃশ যৌগ তৈরি করতে শুরু করে। এই যৌগগুলো জরায়ু এবং পরিপাকতন্ত্রের পেশিতে সংকোচন ঘটায়। জাডকিন্সের মতে, জরায়ু থেকে কিছু প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন রক্তপ্রবাহে মিশে পাশের অন্ত্রে একই ধরনের সংকোচন উদ্দীপিত করে, যা পিরিয়ডের প্রথম দুই দিনে পেটে ব্যথা ও ডায়রিয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অন্য একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে সংযোগকারী ভেগাস নার্ভ এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। প্রদাহ বা চাপের সময় এই নার্ভ সক্রিয় হয়ে অন্ত্রে তরল নিঃসরণ ও পেশির সংকোচন বাড়ায়, যা ডায়রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া পিরিয়ডের এক বা দুই সপ্তাহ আগে প্রজেস্টেরনের উচ্চ মাত্রার কারণে অনেকের কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। যাদের ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস), ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ (আইবিডি) বা এন্ডোমেট্রিওসিস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই উপসর্গগুলো আরও তীব্র হয়।
জাডকিন্স ও তার দল প্রোবায়োটিকের প্রভাব নিয়ে একটি র্যান্ডমাইজড ট্রায়াল পরিচালনা করেছিলেন, যেখানে দেখা যায় প্রোবায়োটিক বদহজমের উন্নতি ঘটালেও ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে খুব একটা কার্যকর নয়। অনেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ব্যবহারের পরামর্শ দিলেও এর কার্যকারিতার তেমন জোরালো প্রমাণ নেই। আইবুপ্রোফেন বা নেপ্রোক্সেনের মতো প্রদাহরোধী ওষুধ প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন কমিয়ে ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে, তবে এগুলো অন্ত্রের আস্তরণে জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে এবং ক্রোনস ডিজিজ বা আলসারেটিভ কোলাইটিসে আক্রান্তদের জন্য তা ক্ষতিকর হতে পারে।
জাডকিন্সের পরামর্শ অনুযায়ী, পিরিয়ডের সময় প্রচুর পানি পান করা, আঁশযুক্ত খাবার (ফল, শাকসবজি, শস্য) গ্রহণ করা এবং অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার পরিহার করা উচিত। হালকা ব্যায়ামও অনেকের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। এই সমস্যা যদি দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। দীর্ঘ সময় ধরে এই বিষয় নিয়ে গবেষণার পর জাডকিন্স মনে করেন, নারী স্বাস্থ্যকে অবহেলার চোখে না দেখে একে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু হিসেবে দেখা উচিত।

