২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকের ঠিক আগে নিজের ক্রীড়া মনোবিদের কাছে গিয়ে চরম আতঙ্কে ভুগছিলেন অস্ট্রেলিয়ান বি-গার্ল র্যাচেল গান, যিনি ক্রীড়াবিশ্বে ‘রেগান’ নামে পরিচিত। থেরাপিস্ট তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সবচেয়ে খারাপ কী ঘটতে পারে? রেগান উত্তর দিয়েছিলেন, “সারা বিশ্ব আমাকে দেখে হাসতে পারে।” থেরাপিস্ট তখন বলেছিলেন, “তোমার কি মনে হয় এমন কিছু ঘটা যৌক্তিক?” রেগানের তখন অট্টহাসি দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। থেরাপিস্টদের এমন সান্ত্বনা সাধারণত সত্যি হলেও রেগানের ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় ভয়টিই বাস্তবে রূপ নিয়েছিল। অলিম্পিকের মঞ্চে তার ‘স্প্রিঙ্কলার’ ও ‘ক্যাঙ্গারু হপস’ নামের অদ্ভুত নাচ তাকে রাতারাতি ইন্টারনেটে ভাইরাল করে তোলে। তাকে নিয়ে তৈরি হয় হাজারো মিম, গভীর রাতের টেলিভিশন শোতে চলে ব্যঙ্গাত্মক আলোচনা, ছড়ায় নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, এমনকি এডিনবরা ফ্রিঞ্জ ফেস্টিভ্যালে তাকে নিয়ে একটি মিউজিক্যালও মঞ্চস্থ হয়।
নেটফ্লিক্সের নতুন তথ্যচিত্র ‘আনটোল্ড রেগান: ব্রেকিং ব্যাডলি’-তে তার অস্ট্রেলিয়ান সহকর্মী বি-গার্ল ফ্লিক্স বলেন, “সে রাতারাতি পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ব্রেকার হয়ে উঠেছিল।” অথচ অলিম্পিকের ছয়টি রাউন্ডে নয়জন বিচারকের কাছ থেকে একটি ভোটও পাননি রেগান। সাউথ ব্রঙ্কসের কৃষ্ণাঙ্গ ও বাদামি তরুণদের হাত ধরে গড়ে ওঠা ‘ব্রেকিং’ শিল্পরূপটির জন্য রেগানের এই কুখ্যাতি কী বার্তা বহন করে, তা নিয়ে এই তথ্যচিত্রে বিস্তারিত কোনো আলোচনা করা হয়নি। অলিম্পিকে ব্রেকিংয়ের যাত্রা বা এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপট এড়িয়ে তথ্যচিত্রটিতে মূলত রেগানের ব্যক্তিগত জীবনের ওপরই বেশি আলো ফেলা হয়েছে। এতে রেগান, তার বাবা-মা, তার স্বামী (যিনি তাকে ব্রেকিংয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন) এবং অস্ট্রেলিয়ান ব্রেকিং অঙ্গনের কয়েকজন নৃত্যশিল্পীর সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন একাডেমিক গবেষকের অলিম্পিকের মূল মঞ্চে পৌঁছানোর গল্প দেখানো হয়েছে, যিনি কল সেন্টারে কর্মরত এক বি-বয়ের প্রেমে পড়ে ব্রেকিংয়ের প্রতি অনুরাগী হয়ে উঠেছিলেন。
রেগানের সমসাময়িক বি-গার্ল টিনিলকস এই তথ্যচিত্রে বারবার ‘নো ইজি প্রপস’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন। এটি হিপ-হপ সংস্কৃতির একটি মূল নীতি, যার অর্থ সম্মান অর্জনের জন্য নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে হবে। ১৯৯৭ সালে আমেরিকান বি-গার্ল এশিয়া ওয়ান এই নামে একটি দল গঠন করেছিলেন। টিনিলকস বলেন, “এটি মূলত পুরুষশাসিত একটি জায়গা ছিল এবং বি-গার্লরা নিজেদের জায়গা তৈরির জন্য লড়াই করছিলেন। কিন্তু নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার পর দেখা গেল অনেকে ক্যারিয়ারের শুরুতেই অতিরিক্ত প্রশংসা পেয়ে যাচ্ছেন।” টিনিলকস নিজে অলিম্পিকের ওশেনিয়া অঞ্চলের বাছাইপর্বে অংশ নেননি, কারণ তিনি ব্রেকিংকে একটি শিল্পরূপ হিসেবেই চর্চা করতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে ৪১ বছর বয়সী ফ্লিক্স বাছাইপর্বে অংশ নিলেও বড় কোনো আশা করেননি। রেগান নিজেই অবাক হয়েছিলেন যখন তিনি একের পর এক ধাপ পেরিয়ে ফাইনালে বি-গার্ল মলির মুখোমুখি হন এবং অলিম্পিকের টিকিট পান। ওশেনিয়া বাছাইপর্বের ভিডিও দেখলে বোঝা যায়, প্যারিস অলিম্পিকের সেই আলোচিত অদ্ভুত নাচগুলো তিনি সেখানে দেননি। সেখানে তার নাচ ছিল অত্যন্ত সাধারণ মানের, যাতে ব্রেকিংয়ের মৌলিক কিছু মুদ্রা ছিল। প্যারিসে এই নাচ দিলে তিনি হয়তো প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়তেন, কিন্তু বিশ্বজুড়ে এমন হাসির পাত্রী হতেন না।
তথ্যচিত্রটিতে রেগানের নাচের ধরন পরিবর্তনের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অলিম্পিকের কয়েক মাস আগে ইউরোপের কিছু প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রেগান বুঝতে পারেন যে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বি-গার্লদের চেয়ে তিনি অনেক পিছিয়ে আছেন। এরপর তিনি ও তার স্বামী তাদের রণকৌশল বদলে ফেলেন। ব্রেকিংয়ের কঠিন শারীরিক কসরত যেমন হেডস্পিন বা উইন্ডমিলের মতো ‘পাওয়ার মুভস’ দিয়ে বিচারকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা না করে তারা ‘মৌলিকত্ব’ বা অরিজিনালিটির ওপর জোর দেন। অলিম্পিকে বিচারকাজের পাঁচটি বিষয়ের (কৌশল, শব্দভাণ্ডার, কার্যকারিতা, সংগীতের তাল এবং মৌলিকত্ব) মধ্যে এটি একটি। তাদের লক্ষ্য ছিল অন্তত একজন বিচারকের কাছ থেকে একটি ভোট পাওয়া। এই মৌলিকত্ব আনতে তারা অস্ট্রেলিয়ার বন্যপ্রাণী (ক্যাঙ্গারু) এবং স্থানীয় কিছু নাচের মুদ্রা থেকে অনুপ্রেরণা নেন। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী সাঁতারের ভঙ্গিও যুক্ত করেন নাচে। তবে এই কৌশল কোনো কাজে আসেনি এবং প্যারিসে তিনি শূন্য ভোট পান।
রেগানের এই পরিস্থিতির সাথে প্যারিস অলিম্পিকে ভাইরাল হওয়া অন্য দুই ক্রীড়াবিদের তুলনা করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের পমেল হর্স বিশেষজ্ঞ স্টিভেন নেডোরোসিক চশমা খুলে অলিম্পিক মঞ্চে নেমে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন এবং ২০২১ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে তার মিমগুলো ছিল প্রশংসাসূচক। একইভাবে তুরস্কের শুটার ইউসুফ দিকেচ কোনো বিশেষ সরঞ্জাম ছাড়াই পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রুপা জিতে ইতিবাচক মিম হিসেবে ভাইরাল হয়েছিলেন। তাদের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট জগৎ রসিকতা করলেও তা কখনো উপহাসে পরিণত হয়নি, কারণ তারা নিজেদের খেলায় বিশ্বমানের পারফর্ম করেছিলেন।

