দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের পূর্ব অঞ্চলে গত দুই মাসে রহস্যজনকভাবে নয়জন নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ সম্প্রতি ডন পার্ক এলাকা থেকে নবম নারীর মরদেহটি উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। একের পর এক এই মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
এর আগে গত জুলাই মাস থেকে জোহানেসবার্গের প্রধান শহুরে এলাকা একুরহুলেনির বিভিন্ন স্থানে আরও আটজন নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। উদ্ধার হওয়া নারীদের কয়েকজনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তাদের পরনে আংশিক পোশাক ছিল। তবে পুলিশ এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি যে এই সবকটি হত্যাকাণ্ড একে অপরের সাথে সম্পর্কিত নাকি কোনো ধারাবাহিক খুনি বা সিরিয়াল কিলার এসবের পেছনে রয়েছে।
এই নৃশংস ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িতদের খুঁজে বের করতে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা চালানো হবে। তিনি বলেন, এই ঘটনাগুলো আমাদের সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
নিহতদের মধ্যে ৩৮ বছর বয়সী এলিজাবেথ "তসোন্তসো" মোসেলাকগোমো গত সপ্তাহে বিকেলে দৌড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হন। এর তিন দিন পর কেম্পটন পার্কের একটি হোটেলের পেছন থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অন্য দুই ভুক্তভোগীর পরিচয়ও শনাক্ত করা গেছে। তাদের একজন ইতোমেলেং কেকানা, যিনি গত জুলাই মাস থেকে নিখোঁজ ছিলেন। অন্যজন হলেন ৩৮ বছর বয়সী দিনো এভলিন মোতাপানে, যার মরদেহ গত মঙ্গলবার কোয়াথেমা এলাকার একটি রাস্তার পাশে পাওয়া যায়।
নয়টি মরদেহের মধ্যে প্রথমটি গত ১৫ জুলাই কেম্পটন পার্কে পাওয়া গিয়েছিল। এর দুই দিন পর জড়িত সন্দেহে একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পুলিশ তাকে অন্য মৃত্যুগুলোর সাথে সরাসরি যুক্ত করেনি। পরবর্তীতে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে কেম্পটন পার্ক, ওলিফ্যান্টসফন্টেইন, ক্লেভিল এবং কোয়াথেমা থেকে আরও কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই ধারাবাহিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা বোঙ্গেকা সেবেলা বিবিসির কাছে নিজের ক্ষোভ ও ভয় প্রকাশ করে বলেন, "আমরা বাড়ি থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছি। দোকানে যেতেও ভয় লাগছে। যে দেশে নারী হিসেবে আমাদের নিরাপদ থাকার কথা, সেখানে আমরা আর স্বাধীন নই।"
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গোয়েন্দা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বহুমুখী তদন্ত দল গঠন করেছে। তারা এই ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না তা খতিয়ে দেখছেন। পাশাপাশি পুলিশ একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে খুঁজছে, তবে সে ঠিক কোন মামলার সাথে জড়িত তা প্রকাশ করা হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ নারীদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং নারীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, "ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে চলা জীবন বাঁচাতে পারে।" পুলিশ এই ঘটনার তথ্যদাতাদের জন্য ৪ লাখ র্যান্ড (প্রায় ২৪,০০০ ডলার বা ১৮,০০০ পাউন্ড) পুরস্কার ঘোষণা করেছে এবং নিখোঁজ স্বজনদের পরিচয় শনাক্তে সহায়তার জন্য পরিবারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মন্ত্রী ফিরোজ কাচালিয়া অবশ্য এখনই কোনো জল্পনা না করার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, আপাতদৃষ্টিতে এগুলো আলাদা ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে। পুলিশ এই পর্যায়ে সিরিয়াল কিলারের বিষয়টি নাকচ না করলেও একটি চক্র এর পেছনে কাজ করছে কি না তা খতিয়ে দেখছে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ নারী সংস্থার (ইউএন উইমেন) মতে, দক্ষিণ আফ্রিকায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার হার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ এবং এখানে নারী হত্যার হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। গত নভেম্বরে দেশটিতে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর একে জাতীয় বিপর্যয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।

