স্পেনের মধ্যাঞ্চলে দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষের ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও নিখোঁজ প্রিয়জনদের সন্ধানে মরিয়া হয়ে ঘুরছেন স্বজনেরা। এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৯ জন নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় ট্রেন পরিচালনাকারী সংস্থা 'রেনফে' (RENFE)-র একটি ট্রেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান 'আইরিও' (Iryo)-র অপর একটি ট্রেনকে সজোরে ধাক্কা দিলে এই বিপর্যয় ঘটে। নিহতদের পাশাপাশি দুর্ঘটনায় মোট ১৮০ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১১০ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর নিখোঁজদের খোঁজে স্বজনদের আকুতি ও শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নিজের বাবা রেনফে ট্রেনের ১৩এ নম্বর আসনে ছিলেন জানিয়ে তাঁর সন্ধানে সেভিল থেকে তোলেদো শহরে ৪৯৫ কিলোমিটার (৩০৭ মাইল) পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে এসেছেন অভিনেতা সেজার ভিসেন্তে। মা ও খালাকে সঙ্গে নিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত এলাকার কাছাকাছি একটি ধর্মীয় কেন্দ্রে রাত কাটিয়েছেন তিনি, যা বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেজার ভিসেন্তে আকুল কণ্ঠে বলেন, "আমার বাবা কোথায় আছেন জানি না। প্রভু, আশা করি তাঁকে খুঁজে পাব।" পরিস্থিতির তীব্রতা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, "আমি চাই না কারো সাথে এমনটা ঘটুক। এটি একেবারেই অসহ্য, যেন সাক্ষাৎ জাহান্নাম।"
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও স্বজনদের সন্ধানে জরুরি আবেদন ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রেনে ওঠার সময় স্বজনদের পরনে কী পোশাক ছিল, দেখতে কেমন ছিলেন এবং তাদের আসন নম্বর কত ছিল তা উল্লেখ করে ছবিসহ পোস্ট করছেন পরিবারের সদস্যরা। ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে আলেহান্দ্রো মারোকিন জানান, গাঢ় নীল রঙের পোশাক পরা তাঁর বোন আদ্রিয়ানা রেনফে ট্রেনের ৮ নম্বর বগিতে ভ্রমণ করছিলেন। ঘটনার পর থেকে তাঁর সাথে কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার সকালে অনুসন্ধানকারী দল যখন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছিল, তখন মারোকিন জানান, "আমরা এখনো প্রার্থনা করছি, এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাইনি।"
ভয়াবহ এই ট্র্যাজেডির পর স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সহায়তা দিতে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উন্মোচন করতে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে সেজন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে সরকারের পুরো দল কাজ করছে। উল্লেখ্য, এটি চলতি বছরে স্পেনে দ্বিতীয় বড় দ্রুতগতির ট্রেন দুর্ঘটনা। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীতমুখী অপর একটি ট্রেনের সাথে ধাক্কা খেলে ৪৬ জন নিহত হন। চীনের পর বিশ্বজুড়ে স্পেনের হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ককে দ্বিতীয় বৃহত্তম ও সফল ব্যবস্থার মডেল মনে করা হতো, যা বিগত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ছাড়াই পরিচালিত হয়ে আসছিল।
দুর্ঘটনার পরপরই দুর্গতদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মাদ্রিদের দক্ষিণে মাত্র আড়াই হাজার জনসংখ্যার ছোট শহর উরদার জীবনযাত্রা বুধবার ভোরে থমকে যায়। স্থানীয় অধিবাসীরা দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার ও সহায়তা করতে শুরু করেন। তারা ট্রেনের যাত্রীদের জন্য স্যান্ডউইচ তৈরি করেন এবং নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে অনেককে নিকটস্থ একটি স্পোর্টস প্যাভিলিয়নে পৌঁছে দেন। দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই কাজ করছিলেন নির্মাণ শ্রমিক ডেভিড গোমেজ, তাঁর ভাই ও এক সহকর্মী। স্প্যানিশ পত্রিকা 'এল পাইস'-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গোমেজ বলেন, "মানুষ জানলা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করছিল। আমরা উদ্ধারকর্মীরা আসার আগেই কাঁটাতারের বেড়া কেটে ভেতরে প্রবেশ করি এবং সাথে থাকা ফার্স্ট-এড কিট দিয়ে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিই।"
দুর্ঘটনায় বিপুল সংখ্যক মানুষ আহত হওয়ায় রক্তের মারাত্মক সংকট দেখা দেয় এবং কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জরুরি রক্তদানের আহ্বান জানানো হয়। এ আহ্বানে অভূতপূর্ব সাড়া দেন সাধারণ মানুষ। দুর্ঘটনাকবলিত কাস্তিয়া-লা মানচা অঞ্চলেই দুই হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবী রক্ত দিতে এগিয়ে আসেন। এ বিষয়ে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অঞ্চলটির প্রেসিডেন্ট এমিলিয়ানো গার্সিয়া-পেজে বলেন, "সর্বকালের রেকর্ডসংখ্যক রক্তদানসহ যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাদের সকলকে আমি ব্যক্তিগত ও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।" তিনি উদ্ধারকাজে নিয়োজিত ১,৩০০ জরুরি সেবা কর্মী ও উদ্ধারকারীকেও ধন্যবাদ জানান।

