বিশ্বের বৃহত্তম আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড বা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো বিশ্বজুড়ে স্থূলতা সংকট মোকাবিলায় নেওয়া সরকারি উদ্যোগগুলোকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসাস অভিযোগ করেছেন, এই কোম্পানিগুলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস প্রচারে নেওয়া সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মামলা করে এ ধরনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করছে।
টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসাস জানান, কোম্পানিগুলোর এই আইনি লড়াইয়ের কারণে বিভিন্ন দেশের সরকার কোটি কোটি ডলারের স্বাস্থ্যসেবা ও আইনি ব্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ, অর্থাৎ বিশ্বের প্রতি ১ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ১ জন স্থূলতায় ভুগছে এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এখন সাধারণ খাদ্যাভ্যাসের অর্ধেক জায়গা দখল করে নিয়েছে।
বিভিন্ন দেশের সরকার স্থূলতা সংকট ও এর অর্থনৈতিক প্রভাব বুঝতে পেরে জাঙ্ক ফুড নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রচারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে প্যাকেটের গায়ে সতর্কবার্তা, অস্বাস্থ্যকর পণ্যের বিজ্ঞাপনে বিধিনিষেধ এবং জাঙ্ক ফুডের ওপর কর আরোপ। যদিও বড় কোম্পানিগুলো প্রকাশ্যে জনস্বাস্থ্যের এই নীতিগুলোকে সমর্থন করার দাবি করে, কিন্তু দ্য গার্ডিয়ান ও অন্যান্য সহযোগীদের এক যৌথ তদন্তে দেখা গেছে, এই কোম্পানিগুলোই পর্দার আড়ালে সরকারের নীতিগুলোকে দুর্বল বা বিলম্বিত করতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, কোম্পানিগুলো প্রায় ৬০০ বছর মেয়াদী আইনি লড়াই চালিয়েছে, যেখানে প্রতিটি মামলার গড় সময়কাল ২.৫ বছর।
তদন্তে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মেক্সিকো, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য নীতি নিয়ে ২৩৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। যদিও অধিকাংশ মামলায় সরকার জয়ী হয়েছে, তবুও এই দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াইয়ের ফলে জনস্বাস্থ্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে কয়েক বছর বিলম্ব ঘটেছে। টেড্রোসের মতে, এই আইনি লড়াইয়ের মূল উদ্দেশ্য কেবল মামলা জেতা নয়, বরং নতুন আইন প্রণয়ন ধীর করা এবং অন্যান্য দেশের নীতিনির্ধারকদের একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে নিরুৎসাহিত করা।
গবেষণায় দেখা গেছে, মামলার তিন-চতুর্থাংশই দায়ের করেছে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য কোম্পানি বা তাদের প্রতিনিধিত্বকারী ট্রেড গ্রুপগুলো। যেসব মামলার বাদী শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, তার ৩৮ শতাংশই কোকা-কোলা, পেপসিকো, মন্ডলেজ, কেলগস, ড্যানোন, ফেরেরো, জিগন্যাক্স এবং হার্টল্যান্ড ফুড প্রোডাক্টস গ্রুপের মতো আটটি বড় কর্পোরেশনের আনা।
টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসাস বলেন, কিছু কোম্পানি তাদের পণ্য স্বাস্থ্যকর করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও, স্থূলতা সংকট মোকাবিলায় তা যথেষ্ট নয়। তিনি কোম্পানিগুলোকে জনস্বাস্থ্য রক্ষার পথে বাধা না হয়ে আইনি লড়াই বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্থূলতা মোকাবিলায় সরকারগুলোর নেওয়া পদক্ষেপগুলো প্রমাণিত এবং কার্যকর, যা বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন বাঁচাতে অপরিহার্য।

