ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বুধবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। দ্রুত বাড়তে থাকা এই ঋণ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর কমানোর মতো বিষয়গুলো বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
২০২৩ সালের মে মাসে কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও) পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ২০২৮ সালে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। তবে সেই পূর্বাভাসের প্রায় দুই বছর আগেই দেশটি এই সীমা অতিক্রম করে ফেলল। চলতি বছরের মার্চে ঋণের পরিমাণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল, অর্থাৎ পাঁচ মাসেরও কম সময়ে আরও ১ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ যুক্ত হয়েছে।
তুলনামূলকভাবে, ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণ প্রথমবার ১ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করতে প্রায় ২০০ বছর সময় লেগেছিল।
২০২০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের গতি আগের কয়েক দশকের তুলনায় অনেক বেশি। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯.৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে প্রায় ৭.৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর এখন পর্যন্ত আরও প্রায় ৩.৮ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ বেড়েছে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের দুই মেয়াদে মোট ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়েও প্রায় ৮.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ বেড়েছে।
সিবিওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ২০২৬ সালে জিডিপির ১০১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩৬ সাল নাগাদ ১২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ঋণ-জিডিপি অনুপাত ছিল ১০৬ শতাংশ।
গত দুই দশকের বড় দুটি সংকট—২০০৭-০৯ সালের মন্দা এবং ২০২০-২৩ সালের কোভিড-১৯ মহামারি—সরকারকে ঋণ নিয়ে ব্যয় বাড়াতে বাধ্য করেছে। ২০১৭ সালের পর থেকে ঋণ বৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কারণ মহামারি মোকাবিলার ব্যয়।
বাজেট পর্যবেক্ষক সংস্থা কমিটি ফর এ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের (সিআরএফবি) প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেন, ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের এই ঋণ শুধু সরকারি খাতা নয়, বরং পুরো অর্থনীতিতে অনুভূত হয় এবং মানুষের পকেটেও এর প্রভাব পড়ে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বছরে প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে, যার ৬০ শতাংশই যায় সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিমা (মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড) এবং সাবেক সেনাসদস্যদের সেবায়।
অথচ রাজস্ব আয় দিয়ে এই ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। উদাহরণস্বরূপ, চলতি বছরের জুলাই মাসে সরকার ৩৩৪ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব পেলেও ব্যয় করেছে ৭৬৬ বিলিয়ন ডলার, যা আয়ের প্রায় দ্বিগুণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের প্রশাসনই ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কিংবা রাজস্ব বাড়িয়ে ঘাটতি কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ব্যয় সংকোচন ও দক্ষতার কথা বলা হচ্ছে, তবুও ঋণ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে বেসরকারি সংস্থা ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি গত বছরের শুরু থেকে আড়াই থেকে সাড়ে তিন লাখ ফেডারেল চাকরি ছাঁটাই করেছে এবং বৈশ্বিক সাহায্য কমিয়ে দিয়েছে।

