যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই) টেক্সাসে কয়েক বছর ধরে বসবাসরত এক ভেনেজুয়েলান নাগরিককে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ায় বহিষ্কার করেছে। এর ফলে ৩৫ বছর বয়সী কার্লোস তেয়েজ সানচেজ নামের ওই ব্যক্তি তার স্ত্রী এবং ৫ মাস বয়সী মার্কিন নাগরিক পুত্র থেকে প্রায় ৬,০০০ মাইল দূরে ছিটকে পড়েছেন। কার্লোস জানান, গত সপ্তাহের আগে তিনি লাইবেরিয়ার নামও শোনেননি। ফ্লাইটের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি জানতে পারেন যে তাকে সিয়েরা লিওন এবং কোত দিভোয়ারের (আইভরি কোস্ট) মধ্যবর্তী এই দেশটিতে পাঠানো হচ্ছে। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার ১৫ ঘণ্টার দীর্ঘ ফ্লাইটে তাকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটির একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে আটকা পড়েছেন।
লাইবেরিয়ার রাজধানী মনরোভিয়া থেকে এক ঘণ্টারও বেশি দূরে একটি প্রত্যন্ত এলাকার হোটেলে কার্লোসকে রাখা হয়েছে। সেখানে ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও হন্ডুরাসসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বহিষ্কৃত অন্য ব্যক্তিদের সাথে তিনি দিন কাটাচ্ছেন। ভিডিও কলে স্প্যানিশ ভাষায় সিবিএস নিউজকে কার্লোস বলেন, "আমি বুঝতে পারছি না যে দেশ নিজেকে বিশ্বনায়ক মনে করে, তারা কীভাবে একজন মানুষের সাথে এমন আচরণ করতে পারে।" তিনি আরও বলেন, "এটি অত্যন্ত কঠিন একটি পরিস্থিতি, যা আমি কারও জন্য কামনা করি না।"
ভেনেজুয়েলার বাসিন্দা কার্লোস ২০২১ সালে নিজ দেশে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। তিনি ডালাসের একটি গাড়ি ডিলারশিপে দিনে কাজ করতেন এবং রাতে তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য উবার ইটস চালাতেন। সিবিএস নিউজ তার বিরুদ্ধে দেওয়ানি অভিবাসন লঙ্ঘন ছাড়া কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ বা সাজা খুঁজে পায়নি। তবে ২০২১ সালে একজন অভিবাসন বিচারক তাকে ভেনেজুয়েলায় ফেরত পাঠানোর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিলেও, আইনিভাবে সেই আদেশ আইসিই-কে তাকে অন্য কোনো তৃতীয় দেশে বহিষ্কার করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবৈধ অভিবাসন বিরোধী অভিযান জোরদার হওয়ার পর আইসিই রেকর্ড সংখ্যক গ্রেফতার শুরু করে। এর অংশ হিসেবে কিছু বন্দিকে তাদের নিজেদের দেশ ছাড়া অন্য প্রত্যন্ত দেশে নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে। কার্লোসও তাদেরই একজন। ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর একটি নিয়মিত অভিবাসন অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় আইসিই তাকে আটক করে। বহিষ্কারের আগে তিনি বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে দীর্ঘ আট মাস বন্দি ছিলেন। গত দেড় বছরে ট্রাম্প প্রশাসন দক্ষিণ সুদান এবং মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মতো বিপজ্জনক দেশসহ বিশ্বের ডজনখানেক দেশের সাথে তথাকথিত "তৃৃতীয় দেশ" বহিষ্কার চুক্তি করেছে।
ডালাসে বসবাসরত কার্লোসের ভাই হুয়ান তেয়েজ জানান, কেন তার ভাইকে লাইবেরিয়ায় পাঠানো হলো সে বিষয়ে কেউ তাদের কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তিনি তার ভাইকে একজন ভালো ও কঠোর পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, "তার সাথে যা ঘটেছে তা তার প্রাপ্য ছিল না।" এদিকে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) সিবিএস নিউজকে জানিয়েছে, ২০২১ সালে দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশের আগে কার্লোসকে একবার বহিষ্কার করা হয়েছিল। বাইডেন প্রশাসনের অধীনে তাকে মুক্তি দেওয়া হলেও গত ১৯ ডিসেম্বর একটি নিয়মিত হাজিরা অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় আইসিই তাকে পুনরায় গ্রেফতার করে।
ডিএইচএস দাবি করেছে যে কার্লোস মেক্সিকোতে ফেরত যাওয়ার একাধিক সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং পরবর্তীতে গত ১৯ আগস্ট তাকে একটি "নিরাপদ তৃতীয় দেশে" পাঠানো হয়। কার্লোসের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই—এমন তথ্য ডিএইচএস অস্বীকার করেনি। তবে তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "যদি কোনো অবৈধ অভিবাসী আদালতে মামলা দায়ের করে নিজ দেশে যেতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে আইন অনুযায়ী আমাদের তাদের জন্য একটি নিরাপদ দেশ খুঁজে নিতে হয়। আর যদি তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে চায়, তবে আমরা তাদের বিনামূল্যে ফ্লাইটের টিকিট এবং ৩,০০০ ডলারের একটি চেক প্রদান করি। সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ তাদের।" লাইবেরিয়ায় থাকা কার্লোস এখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

