গত আগস্ট মাস থেকে টিকটকে এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মার্কিন কনজারভেটিভ রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং ‘টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ’ (Turning Point USA)-এর প্রতিষ্ঠাতা চার্লি কার্ক, যিনি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিহত হয়েছিলেন, তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানারকম বিকৃত, অদ্ভুত এবং কখনো কখনো মেলানকোলিক মেমে ও ছোট ভিডিও ক্লিপের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে গত ১০ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যুর এক বছর পূর্তিকে কেন্দ্র করে এই মেমে তৈরির প্রবণতা চরম আকার ধারণ করেছে, যা নেটিজেনদের কাছে "কার্কিভার্সারি" (Kirkiversary) নামে পরিচিতি পেয়েছে।
এসব মেমেতে চার্লি কার্কের হাসিমুখের ছবিকে শরৎকালের নান্দনিক দৃশ্য, পাম্পকিন স্পাইস ল্যাটে কিংবা "গিলমোর গার্লস" নাটকের ক্লিপের মাঝে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও আবার তার মুখ বসানো হচ্ছে আইকার্লি (iCarly), বার্কেনস্টকস জুতো কিংবা সংগীতশিল্পী লানা ডেল রের ছবিতে। এমনকি স্প্যালেক্সমা (Spalexma)-র তৈরি এআই গান "উই আর চার্লি কার্ক"-কে বিভিন্ন জনপ্রিয় গানের সাথে রিমেক্স করে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাহ্যিকভাবে এসব পোস্টকে অত্যন্ত অদ্ভুত ও কাণ্ডজ্ঞানহীন মনে হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিক।
ডিজিটাল সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানের রাজনৈতিক সহিংসতা, মেরুকরণ এবং প্রতিনিয়ত খারাপ খবরের মুখোমুখি হওয়া জেন-জি (Gen Z) বা তরুণদের জন্য এই মেমেগুলো আসলে বাস্তবতার কঠিন আবেগ থেকে দূরে থাকার একটি মাধ্যম। মন্টক্লেয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটির মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক জোয়েল পেনি বলেন, "সহজ কথায় এটি এক ধরনের কোপিং মেকানিজম বা মানসিক চাপ মোকাবিলার উপায়। চারপাশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সব ঘটনা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়, মেমে তৈরির মাধ্যমে সেগুলোকে কৌতুক বানিয়ে তরুণরা তা হালকা করার চেষ্টা করছে।"
২০২৫ সালে কার্কের মৃত্যুর ঠিক পর পর পরিস্থিতি অবশ্য এমন ছিল না। সে সময় কার্ককে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় শত শত মানুষকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। অন্যদিকে তার সমর্থকরা তাকে একজন সাংস্কৃতিক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তার ছবিযুক্ত পোশাক ও পণ্য বাজারে এনেছিল। মেমে গবেষক এইডান ওয়াকার টিকটকে ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই মেমেগুলো আসলে সেই চরম প্রতিক্রিয়ারই একটি উল্টো পিঠ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা তার ছবিকে এমনভাবে বিকৃত করেছেন যে এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরোধের অস্ত্র না হয়ে সবার জন্য একটি সাধারণ কৌতুকের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সময়ের সাথে সাথে চার্লি কার্কের নাম নিয়ে এক অদ্ভুত শব্দভাণ্ডারও তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) কেউ লিখছেন "মেরি কার্কমাস" (Merry Kirkmas), আবার টিকটকে কেউ কাউকে প্রস্তাব দিচ্ছেন "কার্কেন্টাইন" (Kirkentinte) হওয়ার। এই অনলাইন উন্মাদনা বাস্তব জগতেও ছড়িয়ে পড়েছে। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা ১০ সেপ্টেম্বর একটি "চার্লি কার্কের মতো দেখতে মানুষের প্রতিযোগিতা" (lookalike contest) আয়োজনের ঘোষণা দিলে তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া জেন-জি প্রজন্ম সামাজিক কাঠামোর পতন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরির বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক মহামারি ও যুদ্ধ দেখে বড় হয়েছে। মিশিগান ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক যোগাযোগ গবেষক অড্রে হালভারসেন জানান, প্রচলিত রাজনৈতিক আন্দোলনের বাইরে গিয়ে এই মেমেগুলো তরুণদের এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষুদ্র অনুভূতি দেয়, যা তাদের হাতের বাইরে চলে গেছে। এর মাধ্যমে তারা তাদের রাগ, উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করতে পারে।
তবে এই উদাসীনতার একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। হালভারসেন সতর্ক করে বলেন, একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে এভাবে কৌতুক করা রাজনৈতিক সহিংসতার প্রতি তরুণদের সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে। কার্কের আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকা ২১ বছর বয়সী রিপাবলিকান কর্মী চ্যান্ডলার ক্রাম্পও এই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ক্রাম্প, যিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে ২০১৮ সালের অক্টোবরে কার্কের সাথে দেখা করে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, মনে করেন জেন-জির মধ্যে সহিংসতা নিয়ে উদাসীনতা বাড়ছে। তিনি বলেন, তার বয়সী রক্ষণশীলরা এই মেমেগুলোকে একটি অনুস্মারক হিসেবে দেখছেন যে তাদের আদর্শিক লড়াইয়ে এখনও অনেক কাজ করা বাকি আছে।
