আসন্ন মধ্যবর্তী (মিডটার্ম) নির্বাচনে রিপাবলিকান দল জয়ী হলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিককে ৫,০০০ ডলার করে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। টেক্সাসের ডালাসে রিপাবলিকানদের কনভেনশনে দেওয়া এক দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দেন। তবে এই অর্থ কীভাবে দেওয়া হবে বা এর তহবিল কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য তিনি দেননি। ট্রাম্প শুধু বলেছেন, এই অর্থ অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই খরচ করতে হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে ডেমোক্র্যাটরা একটি "ফাঁকা প্রতিশ্রুতি" বলে আখ্যায়িত করেছে। অনেকেই এই প্রতিশ্রুতির বৈধতা এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিবিসি উত্তর আমেরিকার সম্পাদক সারাহ স্মিথ এই প্রতিশ্রুতির সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন।
নির্বাচনী মৌসুমে ভোটারদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানোর ক্ষেত্রে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এমন বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ঘটনা সম্ভবত এটিই প্রথম। ট্রাম্পের এই ঘোষণা কনভেনশনে উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে তুমুল করতালির সৃষ্টি করে। ট্রাম্প তার বক্তব্যে বলেন, "যদি রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) এবং সিনেট—উভয় কক্ষেই জয়ী হয়, তবে আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫,০০০ ডলারের লভ্যাংশ দেব।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা চাই না আপনারা এই টাকা খরচ করতে কানাডা, চীন বা জার্মানিতে যান। আপনাদের এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই খরচ করতে হবে।" তবে এই খরচের বিষয়টি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, তা স্পষ্ট নয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রানিং মেট এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জেডি ভ্যান্স অবশ্য এই পরিকল্পনার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি জানান, ট্রাম্প আমদানিকৃত পণ্যের ওপর যে শুল্ক আরোপ করেছেন, তা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব এই তহবিলের উৎস হতে পারে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, "প্রেসিডেন্ট মূলত মার্কিন শ্রমিকদের জন্য একটি লভ্যাংশের কথা বলছেন। আমরা প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব পাচ্ছি কারণ প্রেসিডেন্ট বিদেশি কোম্পানি এবং দেশগুলোর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন, যারা এতদিন আমেরিকার শ্রমিকদের সুযোগ লুটে নিচ্ছিল।" তিনি এটিকে কোনো বিতর্কিত ধারণা বলে মনে করেন না।
এর আগেও ট্রাম্প শুল্কের রাজস্ব থেকে ২,০০০ ডলারের চেক দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। অতীতে অন্যান্য মার্কিন রাজনীতিবিদরাও নির্বাচনী সফলতার বিনিময়ে এমন অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে যেকোনো সরকারি ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়ার চূড়ান্ত এখতিয়ার কংগ্রেসের। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি না। ট্রাম্প তার বক্তব্যে এই অর্থ প্রদানের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন চাইবেন কি না, তা স্পষ্ট করেননি। তিনি এই অর্থকে "ট্রাম্প ডিভিডেন্ড" বা "ট্রাম্প লভ্যাংশ" হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে নগদ অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব মার্কিন ফেডারেল আইনে নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের ধনকুবের সমর্থক ইলন মাস্ক সুইং স্টেটগুলোর ভোটারদের জন্য নগদ অর্থ পুরস্কারের ঘোষণা দিলে এই বিষয়টি সামনে এসেছিল। তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের এই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কর কমানোর প্রতিশ্রুতির মতো বৈধ হতে পারে। নিউ মেক্সিকোর আইনজীবী জন ডে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, এটি একটি বৈধ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নির্দিষ্টভাবে ভোট দেওয়ার জন্য সরাসরি ঘুষ দেওয়া নয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরেক নির্বাচনী আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে থাকা বাকস্বাধীনতার সুরক্ষার আওতায় ট্রাম্পের এই বক্তব্য বৈধ বলে গণ্য হবে।
ট্রাম্পের এই প্রতিশ্রুতি এমন এক সময়ে এলো যখন ইরানে চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দেয়। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এই যুদ্ধের কারণে ট্রাম্প নিজের দলের ভেতরেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন। বুধবার ডালাসে বক্তব্য দেওয়ার আগে ট্রাম্প সমর্থকদের সতর্ক করে বলেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধ শেষ হবে না এবং তেলের দামও কমবে না। তবে তেহরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেজন্য এই সাময়িক অর্থনৈতিক কষ্ট মেনে নেওয়া মূল্যবান বলে তিনি যুক্তি দেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ২৭ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক রয়েছেন, যার অর্থ হলো ৫,০০০ ডলারের এই অর্থ প্রদানের জন্য মার্কিন সরকারের প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হবে।
উদাহরণস্বরূপ, কোভিড-১৯ মহামারির চূড়ান্ত সময়ে ডেমোক্র্যাটরা জর্জিয়ায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তাদের দল সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে ২,০০০ ডলারের সহায়তা প্রদান করা হবে।

