ব্রাজিল বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এক বিশেষ মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে। দেশটির সংস্কৃতি, অস্কার-মনোনীত চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে ফাঙ্ক মিউজিক—সবই এখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তারকা এবং পর্যটকদের একটি বিশাল অংশ সবুজ, হলুদ ও নীল রঙে নিজেদের সাজিয়ে দেশটিতে ভিড় জমাচ্ছেন। ফ্যাশন ব্র্যান্ড এবং ইনফ্লুয়েন্সাররাও এই জোয়ারে গা ভাসিয়েছেন।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ব্রাজিলিয়ানরা তাদের সংস্কৃতি ও দেশটির অর্জন নিয়ে এক ধরনের হীনম্মন্যতায় ভুগতেন, যা 'মংরেল কমপ্লেক্স' নামে পরিচিত ছিল। তবে ২০২৬ সালের দিকে এসে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। এখন ব্রাজিলিয়ানরা গর্বের সাথে তাদের দেশীয় ঐতিহ্যের উদযাপন করছেন, যার একটি অংশ হলো পথকুকুর বা 'কারামেলো' প্রাইড, যা দেশটির এক অনানুষ্ঠানিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ২০২৩ সালে 'ব্রাজিলকোর' ফ্যাশন ট্রেন্ডের উত্থানের মাধ্যমেই এই জনপ্রিয়তার জোয়ার শুরু হয়। ব্যাড বানি, এমিলি রাতাজকোভস্কি, হেইলি বিবার, সাবরিনা কার্পেন্টার এবং অ্যাডিসন রের মতো বিশ্বখ্যাত তারকারা এই ট্রেন্ডে অংশ নিয়েছেন। সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারাল স্টাডিজের পিএইচডি প্রার্থী নেলি পেরেইরা জানান, ফ্যাশন জগত যখন খুব নিয়ন্ত্রিত ও একঘেয়ে ছিল, তখন ব্রাজিলের এই প্রাণবন্ত ও রঙিন ধাঁচ এক নতুন উদ্দীপনা নিয়ে আসে।
বর্তমানে ব্রাজিলকোর শুধু ফ্যাশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সঙ্গীত, নৃত্য, চলচ্চিত্র ও ক্রীড়াক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে। জারা ও এইচএন্ডএম-এর মতো ব্র্যান্ডগুলো সবুজ-হলুদ টপ তৈরি করছে, আবার শ্যানেল বা জিল স্যান্ডারের মতো নামী ব্র্যান্ডগুলোও ব্রাজিলের জাতীয় রঙের অনুপ্রেরণায় কাজ করছে। এর ফলে পর্যটনের সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত বছর ৯ মিলিয়নেরও বেশি পর্যটক ব্রাজিল ভ্রমণ করেছেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি।
রিও ডি জেনেরিওতে পর্যটকরা এখন ব্রাজিলকোর পোশাকে সজ্জিত হয়ে রচিনহা ফ্যাভেলা ভ্রমণে যাচ্ছেন। রচিনহার এক ট্যুরে অংশ নেওয়া ৩০ বছর বয়সী বার্সেলোনার পর্যটক এদুয়ার্দো মারিস্তানি জানান, ড্রোন ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ করা এখন পর্যটকদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ। এছাড়া ম্যাডোনা, লেডি গাগা এবং শাকিরার মতো তারকারা যথাক্রমে ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে কোপাকাবানা বিচে বিনামূল্যে কনসার্ট করেছেন। ব্রুনো মার্সও তার ইন্সটাগ্রাম ভিডিওর মাধ্যমে ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, যা ১৩ মিলিয়নেরও বেশি লাইক পেয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষের নজর কেড়েছে।
ব্রাজিলের এই প্রভাবের পেছনে রয়েছে তাদের ডিজিটাল সক্রিয়তা। ১৮৮১ সাল থেকে ব্রাজিলের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ধারা আজ ডিজিটাল যুগে এসে নতুন রূপ পেয়েছে। টিকটকের লাতিন আমেরিকা অপারেশনের প্রধান এডুয়ার্ডো লোরেনজি বলেন, ব্রাজিলিয়ানরা ইন্টারনেটে অত্যন্ত সৃজনশীল এবং তারা যেকোনো বিষয়কে দ্রুত মেম বা সাংস্কৃতিক রেফারেন্সে পরিণত করতে দক্ষ। রচিনহার ৩৬ বছর বয়সী ট্যুর গাইড ভিতোর অলিভেইরা জানান, পর্যটকদের এই আগ্রহ দেশটির অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
তবে সব ট্রেন্ডের মতোই এর জনপ্রিয়তাও হয়তো একসময় স্তিমিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আসন্ন নির্বাচন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ এই জোয়ারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফরাসি কৌতুক অভিনেতা পল ক্যাবানেস মনে করেন, ব্রাজিলের ওপর ভিত্তি করে এখন এত বেশি কন্টেন্ট তৈরি হচ্ছে যে বিষয়টি কিছুটা ক্লান্তিকর হয়ে উঠছে। তবুও, অনেক ব্রাজিলিয়ান বিশ্বাস করেন, দেশটির এই 'সফট পাওয়ার' দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং এটি তাদের দীর্ঘদিনের 'মংরেল কমপ্লেক্স' কাটিয়ে ওঠার পথে একটি বড় ধাপ।

