কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের সব কাজ কেড়ে নিয়ে কর্মসংস্থানের দুনিয়ায় এক বিশাল বিপর্যয় তৈরি করবে—এমন আশঙ্কা বিশ্বজুড়ে অনেকদিন ধরেই চলছে। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, এখনই মানুষের শ্রমের চাহিদা শেষ হয়ে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে না। এমনকি শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণাতেও দেখা গেছে, এই প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে আগে যে ধরনের চরম ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, বাস্তব চিত্র তার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন।
চ্যাটবট ‘ক্লড’ (Claude)-এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক (Anthropic) এআই-এর কর্মসংস্থান সংক্রান্ত প্রভাব নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। অথচ গত বছরের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা দারিও আমোদেই দাবি করেছিলেন, আগামী এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এআই এন্ট্রি-লেভেলের বা প্রাথমিক স্তরের অর্ধেক চাকরি বিলুপ্ত করে দিতে পারে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি এআই-কে মানুষের "সাধারণ শ্রমের বিকল্প" হিসেবে উল্লেখ করেন এবং জুনে সতর্ক করেন যে বিশ্ব একটি চরম বৈষম্য ও অতি-উন্নয়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু অ্যানথ্রোপিকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২২ সালের শেষের দিক থেকে এ পর্যন্ত এআইয়ের কারণে অতি ঝুঁকিপূর্ণ খাতের কর্মীদের বেকারত্বে কোনো পদ্ধতিগত বৃদ্ধি দেখা যায়নি। প্রযুক্তিটির বাস্তব ব্যবহার এখনও এর সম্ভাব্য সক্ষমতার তুলনায় খুবই সামান্য। যেমন, কম্পিউটার ও গণিত খাতের প্রায় শতভাগ কাজ ক্লড তাত্ত্বিকভাবে করতে পারলেও বর্তমানে এটি মাত্র ৩৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করছে।
এআই প্রযুক্তির পেছনে ডেটাসেন্টারগুলোতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হলেও, প্রযুক্তিবিদদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী উৎপাদনশীলতায় কোনো উল্লম্ফন দেখা যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, এআই যুগের প্রথম তিন বছরের শ্রম উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) বিপ্লবের সময়কালের চেয়েও ধীরগতির ছিল। এমনকি ওপেনএআই-এর প্রধান স্যাম অল্টম্যানও এখন এআইয়ের চাকরি কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। মে মাসে তিনি বলেন, "এই খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান যে ধরনের চাকরি বিপর্যয়ের কথা বলছে, তেমন কিছু ঘটবে বলে আমি মনে করি না।" ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) অর্থনীতিবিদ ডেভিড অটরও মন্তব্য করেছেন যে, মানুষের ধারণা অনুযায়ী বিশ্ব এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে না।
এআই সবকিছু করতে পারবে—এমন ধারণার বিপরীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো ‘ও-রিং’ (O-ring) তত্ত্ব। ১৯৮৬ সালের ২৮ জানুয়ারি মহাকাশযান ‘চ্যালেঞ্জার’ উড্ডয়নের ৭৩ সেকেন্ড পর মাঝ-আকাশে বিস্ফোরিত হয়। দীর্ঘ তদন্তে জানা যায়, কম তাপমাত্রায় একটি সস্তা রাবার ও-রিং সঠিকভাবে কাজ না করায় এই কোটি কোটি ডলারের মহাকাশযানটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এই উদাহরণটি ইঙ্গিত করে যে, এআই যতক্ষণ না প্রতিটি কাজ নিখুঁতভাবে করতে পারছে, ততক্ষণ মানুষের বাকি কাজগুলোর গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। এআই মানুষের কিছু কাজ সহজ করে দিলে উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীরা তাদের জটিল কাজগুলোতে বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন, অথবা কম-দক্ষ কর্মীরা এআইয়ের সহায়তায় আরও জটিল কাজ করার সুযোগ পাবেন। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে এআই মানুষের বিকল্প হলেও সামগ্রিক কর্মসংস্থানে এর প্রভাব খুবই সামান্য। কারণ এআই গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে শ্রমের নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে, যা চাকরি হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে দিচ্ছে।
অবশ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। গবেষক জেড কোলকো মনে করেন, কর্মসংস্থানে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। দারিও আমোদেইয়ের দেওয়া এক থেকে পাঁচ বছরের সময়সীমার আরও প্রায় চার বছর বাকি আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের মতে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ডেভিড অটরও মনে করেন, এআই দিন দিন আরও উন্নত হচ্ছে এবং এর অগ্রগতির কোনো শেষ নেই। তবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু বলেন, "ভেতরের মানুষেরা এখনও আগের মতোই আশাবাদী। তারা বিশ্বাস করেন যে আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (এজিআই) খুব শীঘ্রই আসছে।" ইলন মাস্কও তার স্বপ্নে অবিচল রয়েছেন যে, এআই এবং রোবট মিলে একদিন সব কাজ করতে পারবে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে সবার উচ্চ আয় নিশ্চিত হবে এবং কাজ করাটা ঐচ্ছিক হয়ে যাবে।
কম্পিউটার বিপ্লবের শুরুর দিকে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্ট সোলো একটি বিখ্যাত মন্তব্য করেছিলেন, "সব জায়গায় কম্পিউটার দেখা গেলেও উৎপাদনশীলতার পরিসংখ্যানে তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।" নতুন এই প্রযুক্তির সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর খাপ খাইয়ে নিতে আরও প্রায় ১০ বছর সময় লেগেছিল এবং পরে তা পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয়েছিল। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই রকম পথ পাড়ি দিতে হতে পারে। তবে এআইয়ের সামনে আরও কিছু বড় বাধা রয়েছে। এটি মানুষের সব কাজ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অটর বলেন, "সব সমস্যাই গাণিতিক বা কম্পিউটেশনাল নয়।" এআই ভাষা অনুকরণ করতে পারলেও বাস্তব জগতের সঙ্গে তার সংযোগ ঘটাতে পারে না এবং এখনও অনেক বড় ভুল করে থাকে।
এছাড়া এআইয়ের অর্থনৈতিক দিকটিও বেশ ব্যয়বহুল। ডেটাসেন্টারগুলোর পেছনে জিডিপির ২০, ৩০ বা ৪০ শতাংশ বিনিয়োগ করা সাধারণ অর্থনীতির পক্ষে অসম্ভব। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটাসেন্টারগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাবে, যা জাপানের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের চেয়েও বেশি। তাছাড়া, এআই মডেলে বিনিয়োগ দ্রুত অবমূল্যায়িত হয়, কারণ কয়েক মাস আগের মডেলকে পেছনে ফেলে নতুন মডেল চলে আসে। ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু সতর্ক করে বলেন, এআই মডেল তৈরি করা কোম্পানিগুলো হয়তো কখনই লাভ করতে পারবে না এবং তারা প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলার লোকসান গুনছে।

