দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের কাছে একুরহুলেনি এলাকায় একের পর এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গত জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত এই অঞ্চলে একই ধরনের পরিস্থিতিতে অন্তত নয়জন নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলো দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার চিত্রকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার দেশ হিসেবে পরিচিত।
নিহতদের একজন ৩৮ বছর বয়সী দুই সন্তানের জননী দিনেও মোতাপানে। গত রোববার তাঁকে শেষবারের মতো জীবিত দেখা গিয়েছিল। পরে একুরহুলেনির একটি আবাসিক এলাকায় তাঁর ক্ষতবিক্ষত ও আংশিক দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দিনেওর খালা নোখওয়ান্দা মাতশিকিজা অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, 'আমরা কীভাবে দিনেওর ছোট মেয়েকে বোঝাব যে তার মাকে নির্মমভাবে হত্যা করে ময়লার মতো মাঠে ফেলে রাখা হয়েছিল? এই শোক কখনো কাটিয়ে ওঠার মতো নয়।' তিনি এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
একই ধরনের নির্মমতার শিকার হয়েছেন ৩২ বছর বয়সী দোকানদার ইতুমেলেং কেকানা। গত জুলাই মাসে নিখোঁজ হওয়ার ১৭ দিন পর একটি ব্রিজের ওপর থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত ও অর্ধনগ্ন মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ইতুমেলেংয়ের ভাই থেম্বা কেকানা তাঁর বোনের শিশু সন্তানের দিকে তাকিয়ে কান্নাভেজা চোখে বলেন, 'আমরা গভীর শোকে ভেঙে পড়েছি। আমি জানি না কীভাবে এই শিশুটির বুকফাটা কষ্ট দূর করব।'
পুলিশ জানিয়েছে, গত ১৫ জুলাই প্রথম মরদেহ উদ্ধারের দুই দিন পর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে দিনেও, ইতুমেলেং বা বাকি ছয় নারীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। নিহত নারীদের অধিকাংশেরই বয়স ছিল ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এবং মৃত্যুর আগে তারা চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। পুলিশ নিশ্চিত নয় যে এটি কোনো ধারাবাহিক খুনির (সিরিয়াল কিলার) কাজ কি না, কারণ মামলাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে দেশটিতে ৫,৪২৭ জন মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সরকারি পরিসংখ্যানে লিঙ্গভিত্তিক আলাদা হিসাব না থাকলেও, দেশটির মানবাধিকার কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্যে জানা গেছে যে এই তিন মাসে ৫৬৯ জন নারী নিহত হয়েছেন, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ছয়জন। এছাড়া আরও ১,০৫২ জন নারী হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছেন।
এই পরিস্থিতি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে গত বছরের নভেম্বরে যখন লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে 'জাতীয় বিপর্যয়' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রী নোকুজোলা সিসিসি তোলশে তখন বলেছিলেন, এটিকে জাতীয় বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করলে সরকারের পক্ষে এই সংকট মোকাবেলা করা সহজ হবে। জিপি-২০ (G20) সম্মেলনের সময় নারীদের বিক্ষোভের পর এই ঘোষণা এসেছিল।
বর্তমানে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দক্ষিণ আফ্রিকায় 'ফেমিসাইড' বা নারী হত্যাকে একটি পৃথক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সংস্থাটির কান্ট্রি ডিরেক্টর শেনিলা মোহাম্মদ এক বিবৃতিতে বলেন, 'ফেমিসাইডকে আলাদা অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া মানে নারীদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করা। এটি লিঙ্গভিত্তিক একটি অপরাধ, যেখানে একজন নারীকে কেবল নারী হওয়ার কারণেই হত্যা করা হয়।' গ্যাবন ও মরক্কোসহ আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশসহ বিশ্বের ৩৩টি দেশে ফেমিসাইডকে নির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই সংকটের মুখে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা একুরহুলেনির এই অপরাধগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, 'জাতি হিসেবে আমাদের অবশ্যই নারীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার পক্ষে দাঁড়াতে হবে।'

