ভারতের রাজধানী দিল্লিতে জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন প্রভাবশালী ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) আন্দোলনের একটি বড় ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নির্বাচনী সংস্কার এবং ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগে দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুরো দিল্লিকে একপ্রকার দুর্গে পরিণত করেছে প্রশাসন।
বিক্ষোভ দমনে দিল্লির রাস্তায় প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দিল্লির প্রধান বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তর অভিমুখী সমস্ত রাস্তা বিশাল লোহার ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা যাতে রাজধানীতে জড়ো হতে না পারেন, সেজন্য দিল্লিতে আসার বেশ কয়েকটি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে এবং ডজনখানেক মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ।
তবে এই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী অনলাইনভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ঘোষণা দিয়েছেন, যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েই তারা শনিবার সকালে যন্তর মন্তরের দিকে যাত্রা করবেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে উদ্দেশ্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “আপনারা যদি আমাদের জেলে পাঠাতে চান বা গুলি করতে চান, আমরা তার জন্যও প্রস্তুত আছি।”
সিজেপির এই আন্দোলনকে ভারতের বিরোধী দলগুলো, বিভিন্ন কৃষক সংগঠন এবং ছাত্র গ্রুপগুলো সমর্থন দেওয়ায় এটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহত্তম বিক্ষোভ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর আগে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে গ্রীষ্মকালে সিজেপির সপ্তাহব্যাপী আন্দোলনের মুখে গত জুলাই মাসে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরপর গত সপ্তাহে মুম্বাইতে এবং গত বৃহস্পতিবার বেঙ্গালুরুতে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিশাল সমাবেশ করে সংগঠনটি।
দিল্লি পুলিশের কর্মকর্তা নুপুর প্রসাদ এক সংবাদ সম্মেলনে বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, সিজেপির পক্ষ থেকে অত্যন্ত কম সময়ের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, যন্তর মন্তরে কোনো কর্মসূচির আয়োজন করতে হলে অন্তত ১০ দিন আগে আবেদন করতে হয়। এছাড়া অতীতেও সিজেপি পুলিশের আইনি নির্দেশনা মেনে চলেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে সিজেপি এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী তাদের কেবল পুলিশকে কর্মসূচির বিষয়ে অবহিত করার কথা, কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই।
এই রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে গত বছর শুরু হওয়া ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি বিতর্কিত প্রক্রিয়া, যা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর নামে পরিচিত। নির্বাচন কমিশনের দাবি, তালিকায় থাকা দ্বৈত ও অযোগ্য নামগুলো বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে এবং এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ কোটি (১৩০ মিলিয়ন) নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে বিরোধী দল ও অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সিইসি জ্ঞানেশ কুমার ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এই তালিকায় কারচুপি করে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অবশ্য এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।
গত কয়েকদিন ধরে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারতের বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। গত মঙ্গলবার থেকে টানা তিন দিন ধরে দিল্লিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন, যা পুলিশি অ্যাকশনের মাধ্যমে ছত্রভঙ্গ করা হয়। বিক্ষোভের সময় রাহুল গান্ধীকে পুলিশ জোরপূর্বক বাসে তুলে নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
রাজধানীতে ৩০,০০০-এরও বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের বিক্ষোভ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

