লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। ২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে অঞ্চলটিতে যে বামপন্থী বা ‘গোলাপি জোয়ার’ (pink tide) দেখা গিয়েছিল, তা এখন দ্রুত ডানপন্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করার পর থেকে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে। সম্প্রতি কলম্বিয়া ও পেরুর অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন এই রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। মূলত বামপন্থী সরকারগুলোর আমলে ক্রমবর্ধমান সংগঠিত অপরাধ এবং লাগামহীন অর্থনৈতিক মুদ্রাস্ফীতির কারণে ভোটারদের মধ্যে তৈরি হওয়া অসন্তোষই এই পরিবর্তনের মূল কারণ। ডানপন্থী নেতারা এখন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করছেন।
গত জুনের শেষভাগে চূড়ান্ত হওয়া নির্বাচনে দুই দেশেরই ডানপন্থী প্রার্থীরা অত্যন্ত সামান্য ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। পেরুতে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরির মেয়ে কেইকো ফুজিমোরি এবং কলম্বিয়াতে অ্যাবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জয়লাভ করেন। আগামী ২৮ জুলাই কেইকো ফুজিমোরির অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ট্রাম্প একটি মার্কিন প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছেন। অন্যদিকে, আগামী ৭ আগস্ট কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন দে লা এসপ্রিয়েলা। ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচনের প্রচারণার সময় ফুজিমোরিকে সরাসরি বা আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন না করলেও, বিজয়ী এই ডানপন্থী প্রার্থীদের প্রতি তাদের সমর্থন ছিল স্পষ্ট। এছাড়া ট্রাম্প লাতিন আমেরিকার আরও ছয়জন বর্তমান নেতাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন এবং সংগঠিত অপরাধ ও অবৈধ অভিবাসনের মতো আঞ্চলিক সমস্যা মোকাবিলায় ডানপন্থী নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করতে গত মার্চ মাসে ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ সম্মেলনের সূচনা করেছেন।
চ্যাপেল হিল এক্সপার্ট সার্ভে এবং জাতীয় নির্বাচনী আদালতগুলোর তথ্য অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকার ২৩টি দেশের মধ্যে বর্তমানে ৯টিতে ডানপন্থী দল ক্ষমতায় রয়েছে, যেখানে বামপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাত্র ৩টি দেশ। বাকি দেশগুলো মধ্য-ডান বা মধ্য-বামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত। এর আগের মেয়াদে চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, তখন আটটি দেশে বামপন্থী এবং মাত্র চারটি দেশে ডানপন্থী নেতৃত্ব ছিল।
তবে হাইতিতে বর্তমানে কোনো নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নেই। দেশটির সর্বশেষ নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোইসে ২০২১ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর থেকে সেখানে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। অপরাধ, দুর্নীতি ও অস্থিতিশীলতার কারণে নির্বাচন স্থগিত থাকলেও আগামী আগস্টে সেখানে ভোটগ্রহণের একটি সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে, লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধ ও মাদক চোরাচালানের অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে একটি মাদক পাচার চক্রের প্রধান হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। যদিও ভেনেজুয়েলা সরকার একে ‘হাস্যকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে গত জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক হওয়া মাদুরো ও তার স্ত্রী বর্তমানে নিউইয়র্কে মাদক-সন্ত্রাসবাদ এবং অস্ত্র ও মাদক পাচারের মামলায় বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। এছাড়া কলম্বিয়ার বিদায়ী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এবং মেক্সিকোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শিনবাউমের বিরুদ্ধেও মাদক কার্টেলের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছে মার্কিন মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ডিইএ), যা তারা উভয়েই অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, নিকারাগুয়ার নেতা ড্যানিয়েল ওর্তেগা ও রোজারিও মুরিলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সহিংস দমনপীড়ন, নির্বিচার আটক, সুশীল সমাজ ও গির্জার ওপর নিপীড়ন এবং সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার উদাহরণ অন্যতম। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কট্টর ডানপন্থী হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতা গ্রহণের আগে দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি ২০০% ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ট্রাম্পের কড়া সমর্থক মিলেই সরকারি খরচ ও নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে ঋণসংকট দূর করার উদ্যোগ নেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন ট্রেজারি থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তা নিয়েছিল আর্জেন্টিনা, যা তারা কয়েক মাস পর ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যেই সম্পূর্ণ পরিশোধ করে দেয়।
১৯৮৯ সালে স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত বিদেশি নির্বাচনে নিরপেক্ষ থাকার নীতি বজায় রাখলেও ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সেই অবস্থান বদলে গেছে। ২০২৫ সালের মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ‘মনরো নীতি’ পুনরুত্থানের কথা বলা হয়েছে, যার লক্ষ্য পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য ফিরিয়ে আনা। ১৮২৩ সালে কংগ্রেসের এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো এই নীতির রূপরেখা দিয়েছিলেন। মনরো নীতি অনুযায়ী, মার্কিন মহাদেশের মুক্ত ও স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে ভবিষ্যতে কোনো ইউরোপীয় শক্তির উপনিবেশ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। পাশাপাশি এই গোলার্ধের যেকোনো অংশে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর নিজেদের শাসনব্যবস্থা বিস্তারের যেকোনো প্রচেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হিসেবে গণ্য করা হবে।
তবে বর্তমান যুগে যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্বেগ ইউরোপ নয়, বরং চীন, যারা এই অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছে। চীন দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে, যার মধ্যে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং বড় বড় শহরগুলোর আধুনিক সাবওয়ে বা পাতালরেল লাইন অন্যতম। ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চায় পশ্চিম গোলার্ধের দেশগুলো যেন ওয়াশিংটনকেই তাদের প্রথম পছন্দের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এবং অন্যান্য শক্তির সাথে তাদের সহযোগিতাকে নিরুৎসাহিত করা হবে।
লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ বামপন্থী সরকার ‘সাও পাওলো ফোরাম’-এর সদস্য, যা ১৯৯০ সালে ব্রাজিল ও কিউবার নেতাদের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল। এই ফোরাম মূলত ইরান, রাশিয়া ও চীনের সাথে সম্পর্ক জোরদার করে থাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এসক্লুসা মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্প যেভাবে প্রকাশ্যে ডানপন্থী প্রার্থীদের সমর্থন দিচ্ছেন তা নজিরবিহীন। তিনি বলেন, “এটি মোটেও সাধারণ কোনো বিষয় নয়। ট্রাম্প কোনো দ্বিধা ছাড়াই এটি করছেন। বামপন্থীরা একে অপরকে প্রকাশ্যে সাহায্য করলেও ডানপন্থীরা সাধারণত তা করে না। ট্রাম্প মার্কিন নতুন জাতীয় কৌশলের মাধ্যমে এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন।”

