কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তৈরি পোশাকশিল্প। একসময় বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল দেশকে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির পথে নিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তৈরি পোশাক বা আরএমজি খাত। দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পরিচিতিও গড়ে উঠেছে এই শিল্পকে কেন্দ্র করে।
তবে দীর্ঘদিনের সেই স্বস্তির জায়গায় এখন চাপ বাড়ছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশকে ক্রমেই কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে ফেলছে ভিয়েতনাম। তাই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাজারের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিক রপ্তানি তালিকায় এক ধাপ পিছিয়ে পড়লেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সংকট নেমে আসবে—বিষয়টি এমন নয়। তৈরি পোশাকশিল্প এখনো দেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। তবে এটি মনে করিয়ে দিচ্ছে, কোনো দেশের তুলনামূলক সুবিধা চিরস্থায়ী নয়। কয়েক দশক ধরে একটি মাত্র রপ্তানি খাতের ওপর নির্ভরশীল থাকার পর বাংলাদেশকে এখন পরবর্তী প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন খুঁজে বের করতে হবে।
সরকার মনে করছে, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ শিল্প হতে পারে সেই নতুন সম্ভাবনার একটি। জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম ও বিইএআর সামিট ২০২৬-এ সরকার এই খাতকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহব্যবস্থার অংশ করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টরের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। স্মার্টফোন, গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে চিপ। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে এবং সরবরাহব্যবস্থায় নির্ভরতা কমাতে এই খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে।
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা থাকলেও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রবেশ মানেই দেশে বড় আকারের চিপ কারখানা স্থাপন—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। পুরো সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে প্রধানত তিনটি ধাপে ভাগ করা যায়—চিপ ডিজাইন, ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন এবং অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং ও প্যাকেজিং। প্রতিটি ধাপের জন্য প্রয়োজন হয় আলাদা ধরনের দক্ষতা, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো।
চিপ ডিজাইনের কাজ হলো সমন্বিত সার্কিটের কাঠামো তৈরি করা এবং উৎপাদনের আগে সেটির কার্যকারিতা যাচাই করা। এটি মূলত অত্যন্ত দক্ষ প্রকৌশলনির্ভর কাজ, যেখানে উন্নত সফটওয়্যার, বিশেষায়িত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।
অন্যদিকে ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন বা সরাসরি চিপ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হয় কয়েক বিলিয়ন ডলারের কারখানা, অতিবিশুদ্ধ পানি, বিশেষায়িত রাসায়নিক, অত্যন্ত সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি, নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ এবং বহু বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিল্প-পরিবেশ। চিপ উৎপাদনের পর সেগুলো পরীক্ষা, সংযোজন ও বাজারজাত করার উপযোগী করে তোলার কাজ হয় অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং ও প্যাকেজিং ধাপে।
বাংলাদেশের জন্য আপাতত ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন বাস্তবসম্মত লক্ষ্য না হলেও চিপ ডিজাইন, যাচাই, এমবেডেড সিস্টেম এবং পণ্য প্রকৌশলে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭০০-এর বেশি চিপ ডিজাইনার রয়েছেন। প্রতিবছর কম্পিউটার ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক হচ্ছেন। ২০২৪ সালে সেমিকন্ডাক্টরসংক্রান্ত রপ্তানি আয় ছিল ৮০ লাখ ডলারের বেশি।
বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় এই পরিসংখ্যান ছোট হলেও তা প্রমাণ করে, বাংলাদেশ একেবারে শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করছে না। কয়েকটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের জন্য চিপ ডিজাইন, যাচাই এবং এমবেডেড সিস্টেমসংশ্লিষ্ট সেবা দিচ্ছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্ভাবনা তাই তাইওয়ানের মতো বড় চিপ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে চিপ ডিজাইন, ফিজিক্যাল ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, এমবেডেড সফটওয়্যার এবং পণ্য প্রকৌশলের প্রতিযোগিতামূলক কেন্দ্র হয়ে ওঠা। এসব কাজের জন্য উচ্চ দক্ষতার জনবল দরকার হলেও বড় আকারের শিল্প অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে কম প্রয়োজন।
প্রতিযোগিতামূলক খরচে দক্ষ প্রকৌশলী সরবরাহ করা গেলে বাংলাদেশ বহুজাতিক সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠানের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে। বিশেষ করে ভারত ও তাইওয়ানের মতো প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রগুলোর বাইরে কার্যক্রম বিস্তারে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশকে বিবেচনা করতে পারে।
তবে শুধু কম খরচের প্রকৌশলী থাকলেই চিপ শিল্প গড়ে ওঠে না। আধুনিক চিপ উন্নয়নে ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন সফটওয়্যার, ভেরিফিকেশন পদ্ধতি, হার্ডওয়্যার নিরাপত্তা, টাইমিং অ্যানালাইসিস, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নকশা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রকৌশল নথি তৈরির দক্ষতা প্রয়োজন।
এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু তাত্ত্বিক শিক্ষা যথেষ্ট হবে না। শিক্ষার্থীদের শিল্পমানের সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ, অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক, আধুনিক পরীক্ষাগার, ইন্টার্নশিপ এবং বাস্তব চিপ ডিজাইন প্রকল্পে কাজ করার ব্যবস্থা করতে হবে। শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ছাড়া দক্ষ জনবল তৈরি করা কঠিন হবে।
বাংলাদেশের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাস অর্জন করা। চিপের নকশা বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও মূল্যবান মেধাসম্পদের মধ্যে অন্যতম। একটি চিপের ডিজাইনের বাণিজ্যিক মূল্য শত শত মিলিয়ন ডলার হতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, চুক্তি বাস্তবায়ন, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিবিড়ভাবে যাচাই করবে।
চিপের নকশা চুরি বা গ্রাহকের তথ্য ফাঁসের মতো একটি বড় ঘটনাও পুরো খাতের ওপর আন্তর্জাতিক আস্থা নষ্ট করে দিতে পারে। তাই প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি শক্তিশালী আইন, কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
অবকাঠামোও বড় বাধা। ডিজাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাকআপ ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাট সামাল দিতে পারলেও টেস্টিং, প্যাকেজিং বা ভবিষ্যতের কোনো উৎপাদন কার্যক্রমে তা সম্ভব নয়। সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসায় শুধু বিদ্যুৎ থাকলেই হবে না, তা অত্যন্ত স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন হতে হবে।
বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, প্রকৌশল নমুনা এবং প্রোটোটাইপ যন্ত্রাংশ দ্রুত আমদানি-রপ্তানির জন্য দক্ষ কাস্টমস ব্যবস্থাও প্রয়োজন। পাশাপাশি উচ্চগতির আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ, দ্রুত পণ্য ছাড় এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মান পূরণে সক্ষম বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে।
সরকার ২০২৪ সালের ৮০ লাখ ডলার থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি এক বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বলে জানা গেছে। প্রায় ছয় বছরে ১২৫ গুণ প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। এক বা একাধিক বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বড় আকারের কার্যক্রম শুরু করলে এমন প্রবৃদ্ধি সম্ভব হতে পারে। তবে বর্তমান স্থানীয় শিল্পের স্বাভাবিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন।
তাই বাংলাদেশের জন্য ধাপে ধাপে এগোনোই বাস্তবসম্মত পথ। আগামী কয়েক বছর চিপ ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, এমবেডেড সিস্টেম এবং প্রযুক্তি শিক্ষার সম্প্রসারণে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিজাইন ল্যাব স্থাপন, আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যারে প্রবেশাধিকার, স্থানীয়ভাবে তৈরি নকশার বিদেশি কারখানায় পরীক্ষামূলক উৎপাদনের সুযোগ এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশল কেন্দ্র স্থাপনে সহায়তা করা প্রয়োজন।
অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়লে বাংলাদেশ পরবর্তী সময়ে স্বাধীন টেস্টিং ল্যাবরেটরি, পণ্য যাচাই এবং উন্নত প্যাকেজিং কার্যক্রমে প্রবেশ করতে পারে। দক্ষ জনবল, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্রাহক চাহিদা তৈরি হওয়ার পরই ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন নিয়ে ভাবা উচিত।
সেক্ষেত্রেও বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় না গিয়ে শিল্প যন্ত্রপাতি, সেন্সর, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং গৃহস্থালি ইলেকট্রনিক পণ্যে ব্যবহৃত অপেক্ষাকৃত পরিণত প্রযুক্তির চিপকে লক্ষ্য করা যেতে পারে।
তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন শিল্প গড়ে তোলা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং দেশকে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি খাতগুলোর একটির সঙ্গে যুক্ত করবে। তবে শুধু সম্মেলনের ঘোষণা, প্রযুক্তি পার্কের নাম পরিবর্তন কিংবা বড় রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে এই শিল্প গড়ে উঠবে না।
বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বস্ত প্রকৌশল প্রতিভা, নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান এবং উন্নত প্রযুক্তিগত সক্ষমতার গন্তব্য হয়ে উঠতে হবে। এই ভিত্তিগুলো তৈরি করা গেলে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও সংশ্লিষ্ট সেবা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হতে পারে।
চিপ আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর শিল্প গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ বিশাল। তৈরি পোশাকের পর বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তর নির্ভর করবে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাকে কতটা বাস্তবসম্মত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে রূপ দেওয়া যায় তার ওপর।
পোশাকের পর বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা কি সেমিকন্ডাক্টর?
