মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির উইলসন হলে মেলবোর্ন রেয়ার বুক ফেয়ারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন স্বাধীন বইয়ের দোকান 'বুকস ফর কুকস'-এর মালিক টিম হোয়াইট। তাঁর কাছে বই কেবল ভেতরের লেখার জন্য নয়, একটি ভৌত বস্তু হিসেবেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হোয়াইট বলেন, "আমরা খাদ্য ও সমাজের সংযোগ নিয়ে কাজ করি। মানুষ হওয়ার অনুভূতি কেমন, তা আমাদের জানায় এমন সব অনন্য জিনিস আমরা খুঁজি। আমরা এমন সব বই নিয়ে কাজ করি যেগুলোর পেছনে একটি গল্প রয়েছে।"
তবে হোয়াইটের মতো দুর্লভ বই বিক্রেতা ও বিশেষজ্ঞরা এখন একটি নতুন আশঙ্কায় ভুগছেন। জেনারেটিভ এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) কোম্পানিগুলো তাদের প্রযুক্তিকে সমৃদ্ধ করতে ব্যাপক হারে পুরোনো ও দুর্লভ বই সংগ্রহ করছে এবং স্ক্যান করার পর সেগুলো ধ্বংস করে ফেলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অস্ট্রেলিয়ার পুরোনো বই বিক্রেতাদের ধারণা, তারা অজান্তেই এই এআই সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশ হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি তাঁদের কাছে এমন কিছু অস্বাভাবিক অর্ডার এসেছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের অভ্যাসের সঙ্গে মেলে না।
অস্ট্রেলিয়ার একাধিক বিক্রেতা সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান অস্ট্রেলিয়াকে নিশ্চিত করেছেন যে, তারা 'জুম বুকস' নামের একটি কানাডিয়ান কোম্পানির কাছ থেকে প্রচুর অর্ডার পেয়েছেন। জুম বুকস নিজেদের বই রিসাইকেলার বা পুনর্ব্যবহারকারী হিসেবে পরিচয় দেয়। এই অর্ডারগুলো এসেছে সাধারণত অ্যাববুকস (Abebooks) বা বিব্লিও (Biblio)-র মতো বড় সেকেন্ডহ্যান্ড বইয়ের প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে, যেখানে সস্তা পেপারব্যাক থেকে শুরু করে অত্যন্ত মূল্যবান দুর্লভ বইও পাওয়া যায়।
ভিক্টোরিয়ার বেনালার 'গুড রিডিং সেকেন্ডহ্যান্ড বুকস'-এর মালিক ডেলফিনা ম্যানর জানান, গত মে মাসে তিনি জুম বুকসের কাছ থেকে তিনটি বড় বাক্স ভর্তি অর্ডারের অনুরোধ পান। তবে অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে তিনি পরবর্তীতে কোম্পানিটিকে এত বিপুল পরিমাণ অর্ডার না দিতে অনুরোধ করেন। ম্যানর বলেন, "তারা অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করেছিল এবং ডাকমাশুল নিয়ে কোনো দরদাম করেনি। কিন্তু ৩০-৪০টি বই খুঁজে বের করা, প্যাক করা এবং কোনো ভুল হলো কি না তা নিশ্চিত করা আমার জন্য বেশ ঝামেলার ছিল।"
মেলবোর্নের 'সেন্সবারিস বুকস'-এর মালিক জন সেন্সবারি নিশ্চিত করেছেন যে, একই সময়ে তাঁর অনলাইন তালিকা থেকেও জুম বুকস একঝাঁক অর্ডার করেছিল। এই অর্ডারগুলোর ক্ষেত্রে দামের কোনো পরোয়া করা হয়নি এবং বই নির্বাচনও ছিল সম্পূর্ণ এলোমেলো। এর মধ্যে ছিল অত্যন্ত পুরোনো ও অবিক্রিত স্টক। এই অর্ডারের ফলে সেন্সবারিকে বেশ কয়েকটি বাক্স বিদেশে পাঠাতে হয়েছে।
বিক্রেতারা এই ধরনের অর্ডারের ধরন দেখে অবাক হয়েছেন। যেমন একটি অর্ডারে ১৯৭০ সালের মাটির বলবিদ্যার (soil mechanics) ওপর একটি ম্যানুয়ালের পাশাপাশি ২০১০ সালের সাইক্লিং বিষয়ক বই 'বর্ন টু থান্ডার: চ্যাম্পিয়ন্স অব নিউজিল্যান্ড সাইক্লিং', ১৯৮২ সালের অস্ট্রেলীয় কবিতার একটি সংকলন এবং মেলবোর্নের হথর্ন এলাকার স্থানীয় ইতিহাসের বই কেনা হয়েছিল। কবিতার বইটি মাত্র ৯ ডলারে বিক্রি হয়েছিল, যা গত ২০ বছর ধরে দোকানে পড়ে ছিল।
গ্রান্টস বুকশপের মালিক নিক ডাওস ও তাঁর স্ত্রী জেনি অনুমান করেন যে, তাঁদের গুদামে প্রায় ৫ লাখ বই রয়েছে। ডাওস বলেন, "কেউ যদি আমার সব বই কিনে কেটে টুকরো করতে চায়, তবে একদিক থেকে আমি অসন্তুষ্ট হলেও অন্যদিক থেকে খুশি হব। কিন্তু কেউ যদি এসে বলে যে এটিই একমাত্র কপি এবং সে এটি কেটে ফেলবে, তবে আমি তা বিক্রি করতে রাজি হব না।"
লাভের জন্য বই ধ্বংসের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। কিছু বিক্রেতা দুর্লভ বই কিনে ভেতরের ছবি বা ইলাস্ট্রেশনগুলো আলাদা করে বিক্রি করার জন্য বই কেটে ফেলেন। চ্যাটেলেন বুকসের দুর্লভ বই বিক্রেতা গওয়েনিথ টড এই বিষয়টিকে তীব্র ঘৃণা করেন এবং ক্রেতাদের যাচাই-বাছাই করে বই বিক্রি করেন। তিনি বলেন, "আমার কাছে বই কেবল কোনো জড় বস্তু নয়।"
এদিকে এআই জায়ান্ট অ্যানথ্রোপিক-এর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা জুম বুকসের কাছ থেকে কখনো বই কেনেননি। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) প্রশিক্ষণের জন্য বইয়ের উৎস ব্যবহার করা এআই শিল্পে একটি সাধারণ বিষয়। মুখপাত্রের দাবি, অ্যানথ্রোপিক মূলধারার বাণিজ্যিক বাজার থেকে বই সংগ্রহ করে এবং তাদের কোনো প্রোগ্রাম দুর্লভ বা প্রাচীন বই কিনে ধ্বংস করে না।
জুম বুকসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মানরূপ গিল সম্প্রতি লিংকডইনে জানিয়েছেন যে, গত কয়েক মাসে তাদের ব্যবসা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে জুম বুকস বই কেটে স্ক্যান করার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তাদের এক মুখপাত্র গার্ডিয়ান অস্ট্রেলিয়াকে বলেন, "আমরা পুরোনো বই কিনি এবং সেগুলো অক্ষত অবস্থায় পুনরায় বিক্রি করি। আমরা বই ডিজিটাইজ করি না। আমাদের অগ্রাধিকার হলো বইয়ের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা।" তবে কোম্পানিটি এআই ফার্মগুলোর কাছে অক্ষত বই বিক্রি করে কি না, সে বিষয়ে গোপনীয়তা চুক্তির অজুহাতে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

