ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা উপত্যকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ১৫ দফার শান্তি পরিকল্পনা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সাথে প্রকাশ্য মতপার্থক্য তৈরি করে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন। রোববার এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েলের দুর্বলতা এবং বিভিন্ন ফ্রন্ট থেকে সেনা প্রত্যাহারের যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, তা তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছেন। লেবানন, ইরান ও গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের সম্মতি ছাড়া যেকোনো চাপে যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টার সমালোচনা করেন তিনি।
গাজা প্রসঙ্গে নেতানিয়াহু বলেন, ১৫ দফার এই নথি ইসরায়েল গ্রহণ করছে না। তিনি স্পষ্ট করে জানান, হামাস সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) কোনো সেনা প্রত্যাহার করবে না। তার ভাষ্যমতে, এই নিরস্ত্রীকরণের অর্থ হলো হামাসের ছোট-বড় সব ধরনের ভারী ও হালকা অস্ত্র সমর্পণ। তিনি দাবি করেন, এই বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে আমেরিকানদের সাথে আলোচনা চলছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সরাসরি মার্কিন প্রশাসনকে লক্ষ্য করেছেন। গাজা ও লেবাননের সংঘাত এবং ইরান-ইসরায়েল যৌথ হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ নিরসনে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ইসরায়েল একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অক্টোবরে কঠিন নির্বাচনের মুখোমুখি থাকা নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে এবং দেশের অভ্যন্তরে নিজেকে ইসরায়েলের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরতে ট্রাম্পের সাথে প্রকাশ্য বিরোধে জড়াতেও পিছপা হচ্ছেন না।
গত মাসে ট্রাম্প এই শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণার পরপরই ইসরায়েল ফিলিস্তিনি অঞ্চলে বোমা হামলা জোরদার করে, যেখানে গত রোববার ১৮ জন নিহত হয়েছেন। নেতানিয়াহুর কার্যালয় আগেই জানিয়েছিল যে, জনসমক্ষে আসা এই পরিকল্পনা ইসরায়েলের অবস্থান প্রতিফলিত করে না। রোববার তিনি আরও আক্রমণাত্মক সুরে বলেন, যারা আমাদের উপদেশ দিচ্ছেন তাদের বিপরীতে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য যা প্রয়োজন আমরা তা-ই করি। এমনকি প্রয়োজনে সেরা বন্ধুদের বিরুদ্ধেও আমরা অটল থাকতে জানি।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের 'বোর্ড অব পিস'-এর প্রধান নিকোলাই ম্লাদেনভ রোববার ইসরায়েলি টেলিভিশনে বলেন, এই পরিকল্পনাটিই একমাত্র পথ যা নিশ্চিত করতে পারে যে ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি আর ঘটবে না। ট্রাম্পের জন্য নেতানিয়াহুর এই প্রত্যাখ্যান একটি বড় ধাক্কা, কারণ তিনি বিশ্বমঞ্চে শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। আগামী নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান সংকট সমাধান করে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে এবং তেলের দাম কমাতে মরিয়া হোয়াইট হাউস।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলো পরস্পর সংযুক্ত। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে বাফার জোন তৈরি এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররা ইতিমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অতীতে বিল ক্লিনটন থেকে শুরু করে জো বাইডেন প্রশাসন পর্যন্ত অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টই নেতানিয়াহুর সাথে কাজ করতে গিয়ে জটিলতার মুখে পড়েছেন। ট্রাম্পের পূর্বসূরিদের মতোই নেতানিয়াহুকে একজন কঠিন মিত্র হিসেবে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে নেতানিয়াহুর সাথে প্রথম বৈঠকের পর বিল ক্লিনটন বলেছিলেন, "এখানে আসল পরাশক্তি কে?"
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এখন সিদ্ধান্ত নেবেন যে, তিনি নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়াবেন নাকি গাজা শান্তি পরিকল্পনা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখবেন। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে ইসরায়েল ও গাজা যুদ্ধের প্রতি সমর্থন ক্রমশ কমে আসছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবং বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে ইসরায়েলের প্রতি সংশয় প্রকাশ করেছেন।

