ব্রাজিলের আমাজন রেইনফরেস্ট এবং এর ওপর নির্ভরশীল আদিবাসী সম্প্রদায়ের সুরক্ষা নির্ধারণে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি শুরু হতে যাচ্ছে। দেশটির রক্ষণশীল কংগ্রেসের কাছে প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার পরিবেশবান্ধব এজেন্ডাগুলো একের পর এক ধাক্কা খাওয়ার পর এই আদালতকেই এখন পরিবেশ রক্ষার শেষ ভরসা হিসেবে দেখছেন পরিবেশবাদীরা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রাজিলের রক্ষণশীল কংগ্রেস এমন কিছু আইন অনুমোদন করেছে, যা পরিবেশবাদীদের মতে সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। পরিবেশ সুরক্ষায় মনোযোগী লুলা প্রশাসন এসব আইনের বেশ কিছুতে ভেটো দিলেও কৃষি ব্যবসার প্রভাবশালী লবি ও আইনপ্রণেতারা তা অগ্রাহ্য করে আইন পাস করেন। ফলে বিরোধটি শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়।
জলবায়ু পর্যবেক্ষণকারী অলাভজনক সংস্থাগুলোর জোট 'ক্লাইমেট অবজারভেটরি'-র নীতি সমন্বয়ক সুয়েলি আরাউজো বলেন, "আইনসভার ক্ষেত্রে সরকার খুবই দুর্বল। তারা প্রায়ই পরিবেশবিরোধী বিলগুলোর বিরোধিতা করে, কিন্তু কংগ্রেসকে নিজেদের পক্ষে টানার মতো রাজনৈতিক শক্তি তাদের নেই।" তিনি আরও জানান, বর্তমানে আইনপ্রণেতারা ফেডারেল বাজেটের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখছেন, যা রাজনৈতিক দরকষাকষির মূল হাতিয়ার। ফলে সরকারের আলোচনার সুযোগ কমে গেছে।
উল্লেখ্য, ব্রাজিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় সয়াবিন ও গরুর মাংস উৎপাদনকারী দেশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ব্রাজিলের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীন দেশটির মোট গরুর মাংস রপ্তানির ৫০ শতাংশ এবং সয়াবিন রপ্তানির ৭০ শতাংশ কিনেছে। গবাদি পশুর খামার ও সয়াবিন চাষের জন্য কৃষিজমির এই সম্প্রসারণই আমাজনে বন উজাড়ের প্রধান কারণ। তবে 'পার্লামেন্টারি এগ্রিকালচারাল ফ্রন্ট' এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
গত শুক্রবার থেকে সুপ্রিম কোর্ট ২০২৫ সালের একটি রায়ের চূড়ান্ত আপিলগুলো পর্যালোচনা শুরু করেছে। ওই রায়ে আদালত "সময়সীমা তত্ত্ব" (টাইম লিমিট থিসিস) বাতিল করেছিল। কৃষি লবির সমর্থনপুষ্ট এই তত্ত্বে বলা হয়েছিল, ১৯৮৮ সালের ৫ অক্টোবর ব্রাজিলের সংবিধান কার্যকরের দিন যেসব জমিতে আদিবাসীরা বসবাস করছিল বা আইনি বিরোধে ছিল, কেবল সেগুলোর ওপরই তারা দাবি জানাতে পারবে। আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর মতে, এই তত্ত্বের মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীতে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ ও জোরপূর্বক স্থানান্তরের ইতিহাসকে অস্বীকার করা হচ্ছে। আগামী ১৮ আগস্টের মধ্যে এ বিষয়ে বিচারপতিদের ভোট দেওয়ার কথা রয়েছে। আদিবাসী অধিকার রক্ষা সংস্থা 'আর্টিকুলেশন অব ইন্ডিজেনাস পিপলস অব ব্রাজিল'-এর আইনজীবী রিকার্ডো তেরেনা সতর্ক করে বলেন, কিছু প্রস্তাবের কারণে প্রশাসনিক জটিলতা বেড়ে আদিবাসীদের জমি চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া থমকে যেতে পারে।
এই রায়ের ওপর আমাজনের বিচ্ছিন্ন যাযাবর আদিবাসী গোষ্ঠী 'কাওয়াহিভা'র ভাগ্যও নির্ভর করছে। ১৯৯৯ সালে মাতো গ্রোসো রাজ্যে তাদের উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলেও চলতি মাসের শুরুতে তাদের অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ সম্পন্ন হয়।
আগামী বুধবার আদালত আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করবে। এর মধ্যে একটি হলো সয়াবিন স্থগিতাদেশ (সয়া মরটোরিয়াম) চুক্তি বাতিল সংক্রান্ত রাজ্যগুলোর আইন। প্রায় ২০ বছরের পুরোনো এই চুক্তির মাধ্যমে বন উজাড় করা জমিতে উৎপাদিত সয়াবিন কেনাবেচা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রধান প্রধান শস্য ব্যবসায়ীরা এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়, কারণ শীর্ষ সয়াবিন উৎপাদনকারী রাজ্যগুলো এই চুক্তিতে অংশ নেওয়া কোম্পানিগুলোর কর সুবিধা বাতিলের আইন পাস করে। বিচারপতি ফ্ল্যাভিও ডিনো এক আদেশে রাজ্যগুলোর এই আইন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিলেন, যা এখন পূর্ণাঙ্গ আদালত পর্যালোচনা করবে।
এছাড়া বুধবার নতুন পরিবেশগত লাইসেন্সিং আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা আরেকটি মামলার শুনানি হবে। গত ফেব্রুয়ারিতে কার্যকর হওয়া এই আইনে খনি, মহাসড়ক ও শিল্প কারখানার মতো কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্পের অনুমোদন দ্রুত দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। সুয়েলি আরাউজো আশা করছেন, আদালত এই আইনের স্পষ্ট অসাংবিধানিক ধারাগুলো বাতিল করবে। তিনি জানান, এই আইনের কারণে ইতিমধ্যে আমাজনে একটি বিতর্কিত মহাসড়ক পাকা করা এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই একটি বড় নদীতে ড্রেজিংয়ের মতো কাজ শুরু হয়ে গেছে।
ব্রাজিলের পরিবেশ মন্ত্রণালয় সয়াবিন স্থগিতাদেশকে সমর্থন করে জানিয়েছে, এটি বন উজাড় কমাতে বড় ভূমিকা রেখেছে। লাইসেন্সিং আইনের বিষয়ে তারা জানায়, সরকার বিতর্কিত ধারাগুলোতে ভেটো দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এবং তারা একটি দক্ষ, নির্ভরযোগ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সক্ষম জাতীয় লাইসেন্সিং ব্যবস্থার পক্ষে। অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন মামলার বিষয়ে রাষ্ট্রপতির চিফ অব স্টাফের কার্যালয় মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

