মিয়ানমারে সাধারণ মানুষের ওপর বিমান হামলা বাড়াতে কম খরচের মোটরচালিত প্যারাগ্লাইডার ও জাইরোকপ্টারের মতো হালকা আকাশযান ব্যবহার করছে দেশটির সামরিক বাহিনী। জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চালানো এসব হামলায় প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ নাগরিকরা।
জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা (আইআইএমএম) মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, জান্তা বাহিনী এসব কম খরচের আকাশযান ও ড্রোন ব্যবহার করে লক্ষ্যহীনভাবে বোমা ফেলছে। বিশেষ করে সাগাইং অঞ্চলের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, প্যারামোটর চালকরা লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছে তাদের ইঞ্জিন বন্ধ করে দেন। এর ফলে কোনো শব্দ ছাড়াই আকাশযানগুলো নীরবে এগিয়ে যায়, যা বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার বা পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই দেয় না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনী তাদের হামলায় 'ডাবল-ট্যাপ' কৌশল ব্যবহার করছে। এর অর্থ হলো, প্রথম দফা হামলার পর যখন প্রথম উদ্ধারকারী দল, আহতদের সাহায্যকারী এবং সাধারণ মানুষ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন ঠিক সেই জায়গায় দ্বিতীয় দফায় বিমান হামলা চালানো হয়। এর ফলে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যে সক্রিয় শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি জানিয়েছে, চলতি মাসের ১ থেকে ১১ আগস্টের মধ্যে তিনটি শহরে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ২০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে একটি হামলায় প্রায় এক ঘণ্টা ধরে আটটি বিমান অংশ নেয়। সামরিক সরকার অবশ্য জাতিসংঘ বা আরাকান আর্মির এসব অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে অতীতে তারা দাবি করেছিল যে তারা কেবল বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই হামলা চালায় এবং প্রতিরোধ বাহিনীকে 'সন্ত্রাসী' হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।
আইআইএমএম-এর এক বছরব্যাপী তদন্তে সামরিক বাহিনী, তাদের সহযোগী মিলিশিয়া এবং বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সামরিক বাহিনী আয়োজিত নির্বাচনের সময় দেশজুড়ে নির্যাতন ও সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নির্বাচনের আগে ও পরে বিমান হামলা অব্যাহত ছিল এবং তদন্তকারীরা পদ্ধতিগতভাবে বেআইনি আটক, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার প্রমাণ পেয়েছেন।
উল্লেখ্য, নির্বাচনবিরোধী লিফলেট বিতরণ বা অনলাইনে সমালোচনা করার অপরাধে নতুন নির্বাচনী আইনের অধীনে বহু মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যে আইনে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। সমালোচকরা এই নির্বাচনকে ২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করা জান্তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার একটি প্রহসন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে তদন্ত সংস্থাটি কেবল সামরিক বাহিনী নয়, তাদের বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধের অভিযোগও খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিম নারীদের ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, শিশু সেনা নিয়োগ এবং মসজিদ ধ্বংস করার অভিযোগ রয়েছে।
মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন সংস্থা অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (এএপিপি)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারে ৮,০০০-এর বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৩১,০০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আইআইএমএম ১৬০০-এর বেশি উৎস ও প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, যা ভবিষ্যতে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে ব্যবহার করা যাবে। সংস্থাটির প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, "আমরা যেসব প্রমাণ সংগ্রহ করছি, তার প্রতিটির পেছনে রয়েছে এমন কিছু মানুষ যাদের জীবন এই অপরাধগুলোর কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। মিয়ানমারের মানুষ শুধু প্রতিনিয়ত সহিংসতার আশঙ্কার মধ্যেই বাস করছে না, বরং তারা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বয়ে বেড়াচ্ছে।"

