গত বছর মার্কিন সামরিক অভিযানে ইয়েমেনে ১৫৩ জন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ২৪৩ জন আহত হয়েছেন বলে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে পেন্টাগন। দেশটির হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চালানো 'অপারেশন রাফ রাইডার' নামক বিমান ও নৌ অভিযানের মাধ্যমে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। মার্কিন কংগ্রেসে পেশ করা এবং সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের হাতে আসা এক সরকারি প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানে ক্যারিবীয় সাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরে চালানো বিতর্কিত নৌযান হামলার হতাহতের সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হতাহতের এই হিসাব নির্ধারণে মার্কিন সামরিক বাহিনী কোনো সরজমিন পরিদর্শন বা প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার নেয়নি। তারা সম্পূর্ণভাবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট চিত্র এবং বিভিন্ন প্রকাশ্য রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এই মূল্যায়ন তৈরি করেছে। বেসরকারি যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ সংস্থা 'এয়ারওয়ার্স' (Airwars) অবশ্য দাবি করেছে, অপারেশন রাফ রাইডারে অন্তত ২৫৮ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। পেন্টাগনের প্রতিবেদনে ১৫৩ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করা হলেও জানানো হয়েছে যে, বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইয়েমেনে আরও ১৫টি হামলার ঘটনা খতিয়ে দেখছে সামরিক বাহিনী।
পেন্টাগনের এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশ পেল, যখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ-এর অধীনে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য নিয়োজিত বেশ কয়েকটি দপ্তরের বাজেট ও কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। হেগসেথ সামরিক বাহিনীকে "আইনি জটিলতা"র চেয়ে "সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী ক্ষমতা"র দিকে মনোনিবেশ করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি দায়িত্বে আসার পর সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর শীর্ষ সামরিক আইনজীবীদের বরখাস্ত করেন এবং সামরিক আইনজীবীদের তীব্র সমালোচনা করেন। তবে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়ে হেগসেথ কংগ্রেসে বলেছিলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী কখনই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাতে তাদের কোনো ক্ষতি না হয়।
প্রতিবেদনে বাদ পড়া ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরের বিতর্কিত হামলার ঘটনাগুলোতে গত বছর প্রায় ১২০ জন এবং চলতি বছর ৯৫ জন নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, মাদক চোরাকারবারিদের লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে, যাদের তারা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করে। তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসামরিক ব্যক্তিদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এই হামলাগুলো মূলত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। ২০১৮ সালের প্রতিরক্ষা নীতি বিল অনুযায়ী পেন্টাগনের জন্য প্রতি বছর এই হতাহতের প্রতিবেদন (১০৫৭ রিপোর্ট) জমা দেওয়া বাধ্যতামূল করা হয়। ২০১৭ সালে প্রথম বছর প্রায় ৫০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার তথ্য মিলেছিল। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ১ জনে এবং ২০২৪ সালে ২ জনে নেমে এসেছিল, কিন্তু হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযানের কারণে তা আবার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে, 'সিভিলিয়ান প্রোটেকশন সেন্টার অব এক্সিলেন্স'-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাজেট ও কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণে তাদের কার্যক্রম চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ২০২৫ অর্থবছরের শেষে এই কেন্দ্রের কর্মী সংখ্যা ৪০ জন থেকে কমে মাত্র ৯ জনে (৭ জন বেসামরিক এবং ২ জন সামরিক সদস্য) দাঁড়িয়েছে। সামগ্রিকভাবে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস কর্মসূচির কর্মী সংখ্যা ২০২৫ সালের মার্চের পর থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ২০২৬ সালের বাজেট প্রস্তাবে এই কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধের (ডিসএস্টাবলিশমেন্ট) প্রস্তাব করা হয়েছে, যার অধীনে কর্মী খাতে ২০ লাখ ডলার এবং মিশন সহায়তায় ৯৫ লাখ ডলারের বেশি বাজেট কমানোর কথা বলা হয়েছে।
২০২২ সালে কয়েকটি ভুল বিমান হামলার পর এই বেসামরিক ক্ষতি হ্রাস কর্মসূচি ও সেন্টার অব এক্সিলেন্স চালু করা হয়েছিল। পেন্টাগনের তৎকালীন নীতিতে বলা হয়েছিল, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া কেবল নৈতিক দায়িত্বই নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সম্প্রতি প্রতিরক্ষা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজেট কাটছাঁটের কারণে এই সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার মূল উপাদানগুলো ইতোমধ্যেই ক্ষয় হতে শুরু করেছে। প্রতিরক্ষা নীতি বিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি এলব্রিজ কোলবি ইন্সপেক্টর জেনারেলকে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে এই সেন্টারের একটি পর্যালোচনা করার কথা ছিল, তবে তার বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট নয়। পেন্টাগন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম 'দ্য আটলান্টিক' জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন বিমান হামলায় প্রায় ১৭০ জন নিহত হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর পেন্টাগন ছাঁটাই করা পদের অর্ধেক পুনরায় ফিরিয়ে আনার কথা বিবেচনা করছে। পেন্টাগন এখনও ওই হামলার তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করেনি, যা আফগানিস্তান-পরবর্তী বেসামরিক সুরক্ষা সংস্কারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হতে পারে।

