চীনের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির অন্যতম সফল অর্থনৈতিক সংস্কারক চু রংজি ৯৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পরবর্তী সময়ে তিনি দেশটির অন্যতম কার্যকর প্রশাসক হিসেবে বিবেচিত হন। ১৯৮৯ সালের বেইজিংয়ের অস্থিরতা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালে তাকে বেইজিংয়ে তলব করা হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও দলীয় সচিব জিয়াং জেমিনের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি চীনের অর্থনীতি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি পিপলস ব্যাংক অব চায়নার গভর্নর এবং স্টেট কাউন্সিলের ভাইস প্রিমিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় চীনের অর্থনীতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল ছিল এবং অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন যে মাও সে তুংয়ের আমলের মতো দেশটি আবারও অভ্যন্তরীণমুখী হয়ে পড়বে। চু রংজি রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অদক্ষতা দূর করতে এবং অবকাঠামোর আধুনিকায়নে কঠোর ও বিতর্কিত সংস্কার বাস্তবায়ন করেন। দশকের শেষ নাগাদ তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘোষণা করতে পেরেছিলেন যে, চীন বিশ্বের ‘কারখানার’ মর্যাদা অর্জন করেছে, যা আজও বজায় রয়েছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন। একবার হেইলংজিয়াং প্রদেশের এক গভর্নরকে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করেছিলেন তিনি। ১৯৯৮ সালে তিনি বলেছিলেন, “আমি এখানে ১০০টি কফিন তৈরি করে রেখেছি—৯৯টি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য এবং একটি আমার নিজের জন্য।” এই দৃঢ়তার কারণেই তিনি ‘দ্য বস’ ডাকনামে পরিচিতি পান।
তার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) চীনের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। ১৯৮৬ সালে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বহু চুক্তির সমন্বয় করেছিলেন তিনি। তবে তার এই সাফল্যের পথ সহজ ছিল না। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ঋণের বোঝা ও অদক্ষতা কাটাতে গিয়ে প্রায় ৬ কোটি কর্মীকে ছাঁটাই করতে হয়েছিল, যা সে সময় ব্যাপক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছিল।
চু রংজি হুনান প্রদেশের চ্যাংশাতে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় এতিম হওয়ার পর তার চাচার কাছে বড় হন তিনি। ১৯৫১ সালে বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তাকে ‘৭ মে স্কুলে’ অর্থাৎ এক ধরনের বন্দী শিবিরে পাঠানো হয়েছিল, যেখানে তিনি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন।
১৯৮৭ সালে জিয়াং জেমিনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে তিনি সাংহাইয়ের মেয়র হন। ১৯৯০ সালে সাংহাইকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরে তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তিনি তার স্ত্রী লাও আন এবং এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। রাজনীতি থেকে অবসরের পর তিনি জনজীবন থেকে দূরে ছিলেন এবং ২০১৭ সালের দলীয় কংগ্রেসের পর তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

