গত জানুয়ারিতে ডাকবাক্সে একটি চিঠি পেয়েছিলাম। সাধারণত আমার কাছে যেসব চিঠি আসে, সেগুলো বেশ বিরক্তিকর ও একঘেয়ে—যেমন পানির বিলের বিবরণী, ক্রেডিট কার্ডের বিল কিংবা পেনশনের সর্বশেষ আপডেট। কিন্তু এই চিঠিটি ছিল একেবারেই আলাদা। খামটি সাধারণ খামগুলোর চেয়ে বেশ ভারী ছিল। খামের ওপর প্যারিসের পোস্টমার্ক করা ছিল, যে শহরের সঙ্গে আমার তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল, খামের ওপরের আঁকাবাঁকা হাতের লেখাটি ছিল আমার নিজেরই!
চিঠিটি নিজের হাতে লিখেছিলাম সে কথা আমি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলাম, যতক্ষণ না এটি আমার দোরগোড়ায় এসে পৌঁছাল। এর আগের বছর প্যারিস ভ্রমণের সময় আমি একটি চিঠি লেখার ক্যাফেতে গিয়েছিলাম। সেখানকার নিয়মটি ছিল খুব সহজ: আপনি একটি চিঠি লিখবেন (সাধারণত নিজের উদ্দেশ্যে), ক্যাফে কর্তৃপক্ষ সেটি যত্ন করে রেখে দেবে এবং ঠিক এক বছর পর তা আপনার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবে। প্যারিসের সেই সফরে প্রথমবারের মতো ফরাসি খাবার ‘এসকারগো’ (শামুক) খাওয়ার পাশাপাশি আমি নিজের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখেছিলাম। লন্ডনের বাড়ির ঠিকানায় পাঠানো সেই চিঠিতে আমি আমার নিকট ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু প্রশ্ন লিখে রেখেছিলাম—তুমি এখন কী করছ? কোথায় থাকছ? তোমার কি কোনো বয়ফ্রেন্ড আছে?
প্রশ্নগুলো খুব গভীর বা তাত্ত্বিক কিছু ছিল না, কিন্তু চিঠিটি পড়ার পর মনের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করলাম। চিঠিটি আমার নিজেরই লেখা ছিল, কিন্তু মনে হচ্ছিল আমি যেন সেই অতীত সংস্করণ থেকে কিছুটা দূরে সরে এসেছি। এটি ছিল আমার চিন্তাভাবনা ও অনুভূতির এক চমৎকার টাইম ক্যাপসুল, যা সে সময়ের কোনো ছবি বা ডায়েরির পাতায় সেভাবে ধরা পড়েনি।
এই ঘটনার পর আমি অন্যদের কাছেও চিঠি লিখতে শুরু করলাম। শুরুতে মাদ্রিদে আমার নতুন প্রবাস জীবন নিয়ে লন্ডনে থাকা মাকে প্রতি মাসে একটি করে চিঠি পাঠাতাম। চিঠির সঙ্গে মাঝে মাঝে জাদুঘর বা গ্যালারির টিকিট কিংবা রসিদ জুড়ে দিতাম। কখনও কখনও প্রমাণ হিসেবে পাঠাতাম যে আমি সত্যিই মাত্র ৪০ পেন্স দিয়ে একটি পাকা অ্যাভোকাডো কিনতে পেরেছি! যদিও মায়ের সঙ্গে আমার প্রতি সপ্তাহে ফোনে কথা হতো, তবুও চিঠির পাতা আমাকে এমন কিছু কথা বলার সুযোগ করে দিত যা সচরাচর ফোনে বলা হয়ে ওঠে না। যেমন—এখানকার মানুষ কত ধীরগতিতে হাঁটে, তা নিয়ে নিজের অনুভূতি ও চিন্তাভাবনাগুলো চিঠিতে গুছিয়ে লিখতে পারতাম।
কয়েক মাস পর আমার চিঠি লেখার পরিমাণ আরও বেড়ে গেল। সপ্তাহে অন্তত একবার আমাকে পোস্ট অফিসের লাইনে দাঁড়াতে হতো বোন, দেশের কোনো বন্ধু কিংবা ছোট কাজিনদের চিঠি পাঠানোর জন্য। সবাই যে ফিরতি চিঠি লিখত তা নয়, তবে কেবল চিঠি পাঠানোই আমার কাছে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি বা ক্যাথারসিস এনে দিত। এটি আমার জীবনের এমন এক মূল্যবান অভ্যাসে পরিণত হলো, যা ধীরে ধীরে আমার পুরো জীবনযাত্রাকে বদলে দিল।
কাগজে কলম ছোঁয়ানোর অনুভূতি কিংবা চিঠির খামের আঠা লাগানোর স্বাদ ফেসটাইম কল বা পারিবারিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মেসেজে পাওয়া অসম্ভব। তার চেয়েও বড় কথা, প্রতিনিয়ত সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার এক ধরনের তাগিদ বা মানসিক চাপ আস্তে আস্তে কমতে শুরু করল। কারণ আমি অনুভব করলাম, সামনাসামনি বা ডিজিটাল মাধ্যমে যা বলা যায় না, চিঠির পাতায় তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর কথা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। চিঠি লিখে পাঠানোর মধ্যে যেমন আনন্দ ছিল, তেমনি অপর প্রান্ত থেকে ফিরতি চিঠির অপেক্ষা করার মধ্যেও ছিল এক অন্যরকম রোমাঞ্চ।
অন্য কারও হাতের লেখায় নিজের নাম লেখা ভারী একটি চিঠি হাতে পাওয়ার অনুভূতি আমি খুব উপভোগ করতাম। চিঠিটি হাতে পেয়েই আমি সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেলতাম না। আমার ফ্ল্যাটের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় মনে মনে কল্পনা করতাম—চিঠিটি কে পাঠিয়েছে, এতে কী লেখা থাকতে পারে! এরপর পড়ার টেবিলে বসে খুব ধীরে ধীরে, সময় নিয়ে চিঠিটি উপভোগ করতাম। লেখার ছোট ছোট খুঁটিনাটি বিষয় আমার চোখে পড়ত—কোথাও হয়তো কলমের কালি শেষ হয়ে এসেছে, কোনো শব্দ কেটে দেওয়া হয়েছে, কিংবা কোনো একটি শব্দ বারবার ব্যবহার করা হয়েছে।
আজকের দিনে আমরা কোনো কিছুর প্রতি এভাবে মনোযোগ দিই না। এমনকি একটি বই পড়া শেষ করাও এখন কঠিন মনে হয়। ডিজিটাল মাধ্যমে মেসেজগুলো খুব দ্রুত লেখা হয়, তাড়াহুড়ো করে পাঠানো হয় এবং ততটাই দ্রুত ভুলে যাওয়া হয়। একনজর দেখেই উত্তর দিয়ে আমরা অন্য কাজে চলে যাই। কিন্তু চিঠি এভাবে কাজ করে না। চিঠি লিখতে বা পড়তে হলে আপনাকে থামতে হবে, ধীরস্থির হতে হবে এবং আপনি কী পড়ছেন বা লিখছেন তা নিয়ে ভাবতে হবে। চিঠির এই ধীরগতিই আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল। ব্রিটেনের বাইরের এই নতুন জীবনে প্রতিদিন কাজে যাতায়াতের মতো অ্যাপার্টমেন্টের প্রবেশদ্বারের চিঠি বাক্সটি পরীক্ষা করাও আমার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠল।
অবশ্য এর মানে এই নয় যে আমি মেসেজ পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছি বা ফোন ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছি। তবে এখন আর আগের মতো তাড়াহুড়ো অনুভব করি না। আমি কিছু হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ মিউট করে রেখেছি, কিছু আর্কাইভ করেছি এবং সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে না পারলে যে অপরাধবোধ হতো, তা এখন আর কাজ করে না। আমি অন্য ক্ষেত্রেও নিজেকে ধীরস্থির করতে শিখেছি—এখন উত্তর দেওয়ার আগে কিছুটা ভাবি, শব্দ চয়নে সতর্ক হই এবং মেসেজে কথা বলার চেয়ে সরাসরি ফোন করাকেই বেশি প্রাধান্য দিই।
আমি যেখানেই থাকি না কেন, এই নতুন অভ্যাসটি আমাকে এক ধরনের মানসিক স্থিরতা দিয়েছে। এই জানুয়ারিতে আমি নিজের উদ্দেশ্যে আরও একটি চিঠি পাঠিয়েছি লন্ডনে আমার শৈশবের বাড়িতে, যা সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করবে। আমি ভাবি, এক বছর পর যখন চিঠিটি পাব, তখন কি আমি এই আজকের নিজেকে চিনতে পারব?

