৫৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা: দিল্লির বস্তিবাসীদের জীবনযুদ্ধের গল্প বলছে ‘গরমের খাতা’

দিল্লির তীব্র দাবদাহে টিকে থাকার জন্য ৩৯ বছর বয়সী গুলশানকে এক অভিনব ও যন্ত্রণাদায়ক উপায় বেছে নিতে হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল বাঁচানোর জন্য তিনি ও তাঁর পরিবার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ফ্যান ব্যবহার করেন। কিন্তু ফ্যান চললেও রাতে ঘুমানোর আগে গুলশানকে তাঁর সন্তানদের এবং নিজের কাপড় পানিতে ভিজিয়ে নিতে হয়। ভেজা কাপড় শরীরে জড়িয়ে ঘুমানোর ফলে গুলশান ও তাঁর সন্তানদের শরীরে এখন ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ দেখা দিয়েছে এবং এক সন্তানের ত্বকে সংক্রমণও হয়ে গেছে।

চলতি গ্রীষ্মে গুলশান তাঁর এই কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলো একটি খাতায় লিখে রাখতে শুরু করেছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘গর্মি খাতা’ বা গরমের ডায়েরি। গুলশান জানান, অন্তত কেউ একজন তাঁর পরিবারের এই কষ্টের কথা পড়বে ভেবে তিনি কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। উত্তর-পূর্ব দিল্লির সুন্দর নগরী বস্তির ৪০টি পরিবার এখন এই গরমের খাতায় তাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প নথিবদ্ধ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারতের রাজধানীতে দিন দিন দীর্ঘস্থায়ী ও ঘন ঘন তাপপ্রবাহের সৃষ্টি হচ্ছে, যা এখন দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন শহর ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ বা তাপপ্রবাহ মোকাবিলা পরিকল্পনা তৈরি করতে শুরু করেছে। এই পরিকল্পনাগুলোর মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন চরম গরমের প্রস্তুতি ও তা মোকাবিলার উপায় নির্ধারণ করে। কিছু ক্ষেত্রে স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে শহরের সবচেয়ে উত্তপ্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হলেও, সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার তথ্যে এখনও বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ কীভাবে এই গরমের মুখোমুখি হচ্ছে, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

দিল্লির নগর পরিকল্পনাবিদ ও গবেষক অরবিন্দ উন্নি বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, আয়, পেশা, লিঙ্গ, বর্ণ ও শ্রেণির ওপর ভিত্তি করে মানুষের গরমের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। আবহাওয়ার কিছু তথ্য আমাদের কাছে থাকলেও, মানুষ বা সমাজ কীভাবে এই গরম অনুভব করছে এবং তাদের অভিজ্ঞতা কেমন, সেই তথ্যটি একেবারেই অনুপস্থিত। এই শূন্যতা পূরণের জন্যই গ্রিনপিস ইন্ডিয়ার গবেষক নিবেদিতা সাহা ও তাঁর দল এই হিট ডায়েরি বা গরমের খাতার উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে কেবল সংখ্যার বাইরে গিয়ে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা জানা যায়। গ্রিনপিসের জ্যেষ্ঠ প্রচারক আকীজ ফারুক জানান, তাঁরা চেয়েছিলেন বস্তির বাসিন্দারা নিজেরাই নিজেদের গল্প বলুক এবং নিজেদের কষ্টের প্রমাণ নিজেরাই লিখে রাখুক।

এমনই একজন ডায়েরি লেখক হলেন ১৯ বছর বয়সী আরশি। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষণ কোর্সের শিক্ষার্থী এবং এক কামরার ঘরে পরিবারের অন্য পাঁচ সদস্যের সাথে বসবাস করেন। আরশি তাঁর মা ও বোনের সাথে মিলে ট্রাকে ব্যবহারের জন্য আলংকারিক ঝালর তৈরি করেন। সারাদিন কাজ করে তাঁরা মাত্র ১৫০ রুপি (১.১৭ পাউন্ড) আয় করেন। আরশি বলেন, মাঝে মাঝে তীব্র গরম থেকে বাঁচতে তিনি কলেজের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাইব্রেরিতে গিয়ে বসে থাকেন। কিন্তু মা ও বোনকে কাজে সাহায্য করার জন্য তাঁকে আবার সেই গরমের ঘরেই ফিরে আসতে হয়। আরশির এই অভিজ্ঞতাও এখন তাঁর ডায়েরির অংশ।

আরশিদের ছোট ইটের বাড়িটি অত্যন্ত স্যাঁতসেঁতে ও আর্দ্র। বৃষ্টির পর তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ঘরের ভেতর সবাইকে প্রচণ্ড ঘামতে হয়। ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা ২৯.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৮৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) হলেও, ৮৪.৬ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতার কারণে তা অনুভূত হয় ৩৬.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (৯৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট) মতো।

অন্যদিকে, ২১ বছর বয়সী সবজি বিক্রেতা রাজা তীব্র গ্রীষ্মের দিনগুলোতে ঠেলাগাড়িতে সবজি বিক্রি করার সময় ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রার মুখোমুখি হন। তীব্র গরমে তাঁর সবজি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে তাঁকে লোকসান গুনতে হয়। রাস্তায় মানুষের আনাগোনা কমে যাওয়ায় তাঁর আয়ও কমে গেছে। রাতে বাড়ি ফিরেও রাজার কোনো স্বস্তি নেই। তাঁর ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই এবং একটি সিলিং ফ্যান ছাড়া ঠান্ডা হওয়ার কোনো উপায় নেই। দিল্লিতে দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়ায় সূর্যাস্তের পরও ঘরে স্বস্তি মেলে না। নিরুপায় হয়ে রাজা মে মাস থেকে রাতে ছাদে ঘুমাতে শুরু করেছেন যাতে একটু বাতাস পাওয়া যায়।

গবেষক অরবিন্দ উন্নি মনে করেন, রাজার মতো প্রান্তিক কর্মীদের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র যদি নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছায়, তবে সরকার তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। সুন্দর নগরীর বাসিন্দারা যখন তাদের এলাকার তাপমাত্রা পরিমাপ করেন, তখন দেখা যায় রাজার সবজি বিক্রির রাস্তাসহ কিছু গলির স্থলভাগের তাপমাত্রা ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১২৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে গেছে। এখন বাসিন্দারা নিজেরাই ছায়া, পানির ব্যবস্থা বা গাছপালা বাড়ানোর মতো বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছেন।

চলতি গ্রীষ্মে স্যাটেলাইট বিশ্লেষণেও দিল্লির বিভিন্ন এলাকার তাপমাত্রার ব্যাপক পার্থক্য দেখা গেছে। ‘ইন্ডিয়া টুডে’র এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দিল্লির বিমানবন্দর সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিমের মহিপালপুর এলাকায় স্থলভাগের গড় তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ সেখান থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে গাছপালায় ঘেরা অভিজাত এলাকা বসন্ত কুঞ্জে তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

উন্নি মনে করেন, এই ডায়েরি ও স্থানীয়ভাবে করা তাপমাত্রার মানচিত্র শহরের জলবায়ু সহনশীলতার নীতি তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। তবে ভারতের শহরগুলোতে বিকেন্দ্রীভূত উপায়ে কাজ করার মতো প্রশাসনিক সক্ষমতা বা অবকাঠামোর অভাব বড় একটি বাধা। ইতিমধ্যে এই ডায়েরিগুলো ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে (এনএইচআরসি) জমা দেওয়া হয়েছে। সেখানে তীব্র তাপপ্রবাহকে মানবাধিকার সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে এবং সাধারণ মানুষকে সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

গবেষকেরা এই ডায়েরির তথ্যগুলোকে আইনি লড়াইয়ের প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০২৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে জানিয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে সুরক্ষা পাওয়া মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের অংশ। গত ৪ আগস্ট ভারত সরকার তাপপ্রবাহকে জাতীয়ভাবে ঘোষিত দুর্যোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যার ফলে রাজ্যগুলো এখন জরুরি ত্রাণ তহবিল ব্যবহার করতে পারবে। উন্নি ও ফারুক আশা করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে তহবিলগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ব্যবহৃত হবে।

নতুন এই নির্দেশিকায় আশার আলো দেখছেন আরশিও। তিনি বলেন, সরকার যদি আমাদের ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা খরচ ও বিদ্যুৎ বিলের মতো ছোটখাটো বিষয়েও সাহায্য করে, তবে সেটাই আমাদের জন্য বড় জয় হবে। অন্তত তারা বুঝতে পারবে আমরা কী কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।

শিরোনাম :
মাইক্রোসফটের এআই পরিকল্পনা কি চিপের অভাবে থমকে আছে? ফ্রান্সে দাবানল পরিস্থিতি নিয়ে তোপের মুখে প্রধানমন্ত্রী লেকোর্নু শাহজালালে ৩১৯ কেজি নিষিদ্ধ ক্রিমসহ বিপুল চোরাচালান পণ্য আটক আয়ারল্যান্ড সিরিজের জন্য ইংল্যান্ডের অধিনায়ক চার্লি ডিন ভোটার তালিকা চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ৩১ মামলা: কী অবস্থা এখন? কুড়িল দ্বীপপুঞ্জ সফর নিয়ে জাপানের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় এক সপ্তাহে ১৩ বার রাশিয়ার হামলা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চতুর্থ দিনে ভারতের কৌশল নিয়ে আকাশ চোপড়ার উদ্বেগ অ্যাভেলিনোতে ধারে যোগ দিলেন ইন্টারের তরুণ মিডফিল্ডার বেরেনব্রুখ ওমান বাধা দিলে বোমা হামলার হুমকি দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প মাইক্রোসফটের এআই পরিকল্পনা কি চিপের অভাবে থমকে আছে? ফ্রান্সে দাবানল পরিস্থিতি নিয়ে তোপের মুখে প্রধানমন্ত্রী লেকোর্নু শাহজালালে ৩১৯ কেজি নিষিদ্ধ ক্রিমসহ বিপুল চোরাচালান পণ্য আটক আয়ারল্যান্ড সিরিজের জন্য ইংল্যান্ডের অধিনায়ক চার্লি ডিন ভোটার তালিকা চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ৩১ মামলা: কী অবস্থা এখন? কুড়িল দ্বীপপুঞ্জ সফর নিয়ে জাপানের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় এক সপ্তাহে ১৩ বার রাশিয়ার হামলা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চতুর্থ দিনে ভারতের কৌশল নিয়ে আকাশ চোপড়ার উদ্বেগ অ্যাভেলিনোতে ধারে যোগ দিলেন ইন্টারের তরুণ মিডফিল্ডার বেরেনব্রুখ ওমান বাধা দিলে বোমা হামলার হুমকি দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প